Close
Showing posts with label ইসলামী আন্দোলন. Show all posts
Showing posts with label ইসলামী আন্দোলন. Show all posts

Saturday, May 16, 2026

উপশাখা সম্প্রসারণ ও মজবুতি অর্জনে দায়িত্বশীলের করণীয়

উপশাখা সম্প্রসারণ ও মজবুতি অর্জনে দায়িত্বশীলের করণীয়

উপশাখা কী?

কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনস্থ শাখাসমূহের আওতায় সারা দেশের সংগঠনকে যে ক্ষুদ্রতম কর্মক্ষেত্রে বিভক্ত করা হয় তাই উপশাখা। উপশাখা হচ্ছে সংগঠনের মৌলিক স্তর। যে শাখায় উপশাখাসমূহ যত বেশি শক্তিশালী, সক্রিয় ও নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্ষম, সে শাখা তত বেশি সামগ্রিক কাজের দিক দিয়ে অগ্রগামী। আর উপশাখা যেখানে দুর্বল, সেখানে সংগঠনের গতিও শ্লথ। আর তাই উপশাখা সম্প্রসারণ ও মজবুতি অর্জনের মাধ্যমেই একটি আদর্শের অনিবার্য বিজয় সুনিশ্চিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আদর্শ উপশাখার বৈশিষ্ট্য, করণীয় ও নিয়মিত কার্যক্রমসমূহ নিম্নোক্ত বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো-


দায়িত্বশীল 

যিনি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, নির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতির আলোকে ময়দানের চাহিদা অনুযায়ী অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং সুনির্দিষ্টভাবে কর্মী পরিচালনা করেন, তাকে দায়িত্বশীল বলে। 


উপশাখার পরিচয়

সংগঠন স্বীকৃত প্রাথমিক ইউনিট।

বাস্তব কাজের ক্ষেত্র।

Recruiting Centre.

Supply Center.

Production Center.

One kind of industry.


উপশাখার গুরুত্ব

উপশাখাসমূহ সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করে।

রিক্রুটিং সেন্টার হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

প্রচুর সংখ্যক সমর্থক, বন্ধু ও সাধারণ ছাত্র উপশাখার সাথে জড়িত থাকে।

দাওয়াতি কাজের আসল ক্ষেত্র।

নেতৃত্ব তৈরির প্রাথমিক স্তর।


উপশাখার একটি উদাহরণ

উপশাখা হলো রশি, জাল ও সিসা সংবলিত মাছ শিকারের ১টি জালের মতো। রশি ও জাল যতই মজবুত হোক, সিসা না থাকলে যেমন কাঙ্ক্ষিত মাছ শিকার করা যায় না, অনুরূপভাবে আপাতদৃষ্টিতে সব ঠিক আছে মনে হলেও উপশাখার কার্যক্রম যথাযথ না থাকলে সংগঠন দুর্বলই থেকে যায়। আদর্শ সংগঠনের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো মজবুত উপশাখা।


আদর্শ উপশাখার বৈশিষ্ট্য

১. চেইন অব লিডারশিপ (নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা) থাকা।

২. নিয়মিত বৃদ্ধি (সাথী, কর্মী, সমর্থক, বন্ধু, সুধী) হওয়া।

৩. ব্যয় অনুযায়ী আয় নিশ্চিত হওয়া।

৪. সকল ধরনের তালিকা ও রেজিস্টার আপডেটেড থাকা।

৫. ঊর্ধ্বতন সংগঠনের যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকা।


আদর্শ উপশাখার করণীয়

১. উপশাখার কর্মী বৈঠকে মাসিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ওয়ার্ড/ইউনিয়ন/থানা দায়িত্বশীলকে দেখানো।

২. প্রতিমাসে ৪টি মৌলিক প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করা। মাসের ১ম সপ্তাহে কুরআন তালিম, ২য় সপ্তাহে সামষ্টিক পাঠ, ৩য় সপ্তাহে যেকোনো একটি দাওয়াতি প্রোগ্রাম (সাধারণ সভা, চা-চক্র, ফলচক্র, সাধারণ জ্ঞানের আসর, কুইজ প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম ইত্যাদি) এবং শেষ সপ্তাহে কর্মী বৈঠকের আয়োজন করা।

৩. উপশাখায় একটি দাওয়াতি গ্রুপ নিশ্চিত করে প্রতি সোমবারে গ্রুপ দাওয়াতিবার পালন করা। গ্রুপ দাওয়াতি কাজের স্থান ও সময় নির্ধারণ করে পূর্বেই অগ্রসর কর্মীদের জানিয়ে দেওয়া এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে বাংলা কিশোর পত্রিকা, স্টিকার-কার্ড, দাওয়াতি বই বিক্রয় ও বিতরণ করা।

৪. মাসের প্রথম সপ্তাহে সকল কর্মী-সক্রিয় সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিকট থেকে বায়তুলমাল সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন সংগঠনের নিকট জমা দিয়ে রসিদ সংগ্রহ ও আয় বৃদ্ধির ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। পাশাপাশি টেবিল ব্যাংক, দোকান বাক্স ও কলসের মাধ্যমে ছাত্রকল্যাণ আদায় করা।

৫. ঊর্ধ্বতন সংগঠনের কোনো প্রোগ্রাম থাকলে সেই কর্মসূচিতে সকল কর্মী-সমর্থকদের যথাসময়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৬. মাস শেষে নির্ধারিত ফরমেটে সকল কাজের রিপোর্ট তৈরি


করা ও খাতায় ওঠানো। উপশাখা দায়িত্বশীল বৈঠকে উপস্থিত হয়ে রিপোর্ট পেশ করা এবং এক কপি ঊর্ধ্বতন সংগঠনে জমা দেওয়া। দায়িত্বশীল ভাইদের পর্যালোচনা ও পরামর্শ উপশাখা রেজিস্টারের নির্ধারিত পাতায় নোট করে দায়িত্বশীল ভাইয়ের স্বাক্ষর নেওয়া।

৭. কর্মী বৃদ্ধির জন্য টার্গেটকৃত সমর্থকদের মাসের শুরুতেই (প্রথম তিন দিনের মধ্যে) রিপোর্ট বই/ফরম পৌঁছানো, মাসব্যাপী তত্ত্বাবধান, সাহচর্য প্রদান এবং মাসের শেষে ব্যক্তিগত রিপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করা।

৮. প্রতিমাসে পাঠাগারে বই বৃদ্ধির প্রচেষ্টা এবং জনশক্তিকে নিয়মিত বই পড়তে উৎসাহিত করা। সকল কর্মী-সমর্থকের নিকট প্রতিমাসে কমপক্ষে একটি বই পৌঁছানো এবং বইটি পড়া হয়েছে কিনা তদারকি করা। প্রদানকৃত বইয়ের ইস্যু রেজিস্টার নিশ্চিত করা।

৯. উপশাখায় প্রতিমাসে কমপক্ষে ১ জন কর্মী, ২ জন সমর্থক, ৩ জন বন্ধু এবং ১ জন শুভাকাঙ্ক্ষী বৃদ্ধি করা।

১০. উপশাখা রেজিস্টার খাতায় নিয়মিত তথ্য সংরক্ষণ করা (কার্যবিবরণী, বায়তুলমাল রিপোর্ট, জনশক্তির তালিকা ইত্যাদি)।

১১. উপশাখার প্রোগ্রামসমূহে উপস্থিত মেহমানবৃন্দের নাম ও দায়িত্ব কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা।


উপশাখা মজবুতিতে করণীয়

১. উপশাখার এরিয়া ও সামগ্রিক অবস্থা (রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক পরিবেশ) সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান রাখা।

২. ৫ম শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায়ের সকল ছাত্রদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ। এক্ষেত্রে মেধাবী ছাত্র, স্থানীয় প্রভাবশালী ছাত্র, অমুসলিম ছাত্র ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের পৃথক পৃথক তালিকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। পাশাপাশি সকল তথ্য ও তালিকার যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।

৩. ৪ ক্যাটাগরির (সিঙ্গেল ডিজিট, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত, প্লেসধারী, প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান) ছাত্রদের মাঝে টার্গেট করে কাজ করা। পাশাপাশি সমাজের প্রভাবশালী মহলের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি।

৪. কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করা ও সংগঠনের মাঝে টিম স্পিরিট সৃষ্টি।

৫. বেইজ এরিয়া তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৬. নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা তৈরিতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। সেই আলোকে উপযুক্ত কর্মী গঠন করা।


ব্যক্তিগত দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি

১.  ব্যক্তিগত পরিচয়ের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজের সূচনা করা।

২. নিয়মিত সাক্ষাৎ ও সম্প্রীতি স্থাপনের মাধ্যমে আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া।

৩. সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে সে সংগঠনকে পছন্দ না করলে কিংবা সংগঠনের সাথে আমার সম্পৃক্ততা জেনেও আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে দ্বিধা করবে না।

৪. কর্মপদ্ধতির আলোকে ক্রমধারা অবলম্বন করে দাওয়াত পৌঁছাতে উদ্যোগী হওয়া।

৫. দায়ীর বৈশিষ্ট্য অর্জন ও ধারণ করা।

৬. কর্মপদ্ধতির আলোকে ক্রমান্বয়ে কর্মী পর্যায়ে নিয়ে আসা।


কর্মীগঠন প্রক্রিয়া

১. যোগাযোগকারীর বৈশিষ্ট্য অর্জন

২. সাহচর্য দান

৩. মানসিক দৃঢ়তা অর্জনে সাহচর্য প্রদান

৪. পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ ও সুন্দর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা

৫. ছোটোখাটো দায়িত্ব অর্পণ

৬. অর্থদানে উদ্বুদ্ধকরণ

৭. প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান

৮. দাওয়াতি কাজে সক্রিয়করণ

৯. কাজের রিপোর্ট গ্রহণ

১০. আল্লাহর নিকট দোয়া করা


উপশাখা দায়িত্বশীলের গুণাবলি

১. জ্ঞানের ক্ষেত্রে যোগ্য হওয়া।

২. আমল ও মুয়ামেলাতের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন।

৩. নৈতিক মানে শ্রেষ্ঠ হওয়া।

৪. জনশক্তিদের (কর্মী ও সমর্থক) মধ্যে সবচাইতে আস্থাভাজন ব্যক্তি হওয়া।

৫. সবর/ধৈর্যশীল হওয়া।

৬. সাহসিকতাপূর্ণ হওয়া।

৭. জরুরি বা যেকোনো পরিস্থিতিতে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারদর্শী।

৮. ভ্রাতৃত্ব ও প্রেরণা সৃষ্টির যোগ্যতা।

৯. ত্যাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী হওয়া।

১০. জনশক্তিদের মাঝে ইনসাফ কায়েম করা।

১১. সুবক্তা।

১২. নথিপত্র ও হিসাব সংরক্ষণে পারদর্শী।


উপশাখা দায়িত্বশীলের জন্য আবশ্যক 

ময়দানগত

* উপশাখার এরিয়া সর্ম্পকে জানা

* প্রতিদিন গড়ে ১ ঘন্টা সময় দেওয়া

* সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ

* যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মবণ্টন

* উপযুক্ত তত্ত্বাবধান

* সংবাদ আদান প্রদান

* নিয়মিত দাওয়াতি কাজ করা (স্কুল, খেলার মাঠ, মেস, মসজিদ)

* দাওয়াতি উপকরণসহ এক মসজিদে আসর অন্য মসজিদে মাগরিব নামাজ আদায় করা।


জ্ঞানগত

* কুরআন-হাদিসের জ্ঞান

* সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আয়ত্ত করা

* সংগঠনের স্ট্রাকচার জানা

* সংগঠনের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা


আমলগত

* উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া

* আস্থাভাজন হওয়া

* ধৈর্যশীল হওয়া

* আমানতদার হওয়া

* ইনসাফ কায়েম করা


উপশাখার প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রামসমূহ ফলপ্রসূ করতে করণীয়

১. পূর্বেই বিষয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কর্মী-সমর্থকদের ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার অনুভূতি, সাংগঠনিক বুঝ, জ্ঞানগত যোগ্যতা ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে বিষয় নির্ধারণ করা যেতে পারে।

২. প্রাণবন্ত আলোচনার জন্য পূর্বনির্ধারিত বিষয়ের ওপর পরিচালকের পর্যাপ্ত স্ট্যাডি করা প্রয়োজন। কুরআন-হাদিসের আলোকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনকে বোঝানোর বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।

৩. মাঝেমধ্যে ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের (ওয়ার্ড/থানা পর্যায়ের দায়িত্বশীল) দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে।

৪. ছুটির দিনে অথবা ছাত্রদের অ্যাকাডেমিক শিডিউল বিবেচনায় নিয়ে প্রোগ্রামের সময় নির্ধারণ করা।

৫. সামর্থ্যের আলোকে আকর্ষণীয় নাস্তার আয়োজন রাখা।

৬. প্রোগ্রামগুলোকে ইফেক্টিভ করতে মাঝে মধ্যে সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রতিযোগিতা/পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

৭. মাঝে মধ্যে পূর্বের প্রোগ্রামের রিভিউ নেওয়া; কতটুকু মনে রাখতে বা ধারণ করতে পারল।

৮. ন্যূনতম তিন দিন পূর্বে প্রোগ্রামের দাওয়াতি কাজ করা প্রয়োজন।


২০২৬ সালের বার্ষিক পরিকল্পনায় উপশাখা-সংক্রান্ত আলোচনা 

২০২৬ সালের বার্ষিক পরিকল্পনায় উপশাখা মজবুতকরণকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সাংগঠনিক সেশনের স্লোগানটিই উপশাখাকে হাইলাইটস করে নেওয়া হয়েছে। এ বছরের স্লোগান হলো-

মজবুত উপশাখা, ফলপ্রসূ প্রশিক্ষণ

গড়ে তুলি প্রজন্ম, সফল করি আন্দোলন


এ ছাড়াও উপশাখা সংক্রান্ত নিম্নোক্ত বিষয়াদি বার্ষিক পরিকল্পনায় বিদ্যমান-

মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি-২

জনশক্তিকে সাহচর্য প্রদান, সুষম কর্মবণ্টন, প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন সম্প্রসারণ ও উপশাখা মজবুতিকরণ।

একনজরে অর্জিতব্য টার্গেটসমূহ-(সংগঠন)

সকল নিষ্ক্রিয় উপশাখাকে সক্রিয়করণ এবং নতুন করে ২৮% উপশাখা তথা ১০০০০টি উপশাখা বৃদ্ধি করা হবে। 


কর্মপরিকল্পনাসমূহ

১ম দফা : দাওয়াত

১.১.৪. উপশাখাকে গুরুত্ব দিয়ে সংগঠনের সকল স্তরে মাসে ন্যূনতম ১টি করে দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা হবে।

১.১.৮. দাওয়াতি মিশনকে সামনে রেখে ঢাকাসহ সারা দেশে ‘যত মাঠ তত টিম’ গঠন করা করা হবে। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আবাসিক সংগঠনসমূহ উপশাখাভিত্তিক কমপক্ষে ১টি করে স্পোর্টস টিম গঠন নিশ্চিত করবে।

১.১.১১. সকল জনশক্তিকে দাওয়াতি গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতি সোমবার সাপ্তাহিক গ্রুপ দাওয়াতি বার পালন করা হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক উপশাখা কমপক্ষে ১টি গ্রুপ বের করবে।


২য় দফা : সংগঠন

২.১.১. নতুন উপশাখা বৃদ্ধির লক্ষ্যে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বছরের শুরুতেই সংগঠন নেই এমন প্রতিষ্ঠান ও এলাকাসমূহের তালিকা তৈরি করে জনশক্তিদের মাঝে কাজ বণ্টন করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক নির্ধারণের মাধ্যমে টার্গেটকৃত প্রতিষ্ঠান ও এলাকাসমূহে নিয়মিত সফর, তদারকি করা ও প্রতিমাসে পর্যালোচনা করা হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি আবাসিক থানা প্রশাসনিক ভোটকেন্দ্রকে ভিত্তি করে উপশাখা বৃদ্ধির জন্য টার্গেট নেবেন।

২.১.২. উপশাখাসমূহের মজবুতি অর্জন ও শতভাগ সক্রিয়করণের লক্ষ্যে সেশনের শুরুতেই সকল উপশাখার সেটআপ সম্পন্ন করা, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও রেজিস্টার খাতা হালনাগাদ ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হবে।

২.১.৪. শাখা ও থানাভিত্তিক উপশাখা দায়িত্বশীল সমাবেশ ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হবে। এক্ষেত্রে প্রতি ৩ মাস অন্তর উপশাখা দায়িত্বশীলদের নিয়ে প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রাম নিশ্চিত করা হবে।

২.১.৫. যেসব আবাসিক এলাকায় সংগঠন নেই সেখানে উপশাখা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে সমর্থক সংগঠন তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হবে। এক্ষেত্রে মসজিদকে কেন্দ্র করে উপশাখার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

২.১.৬. সংগঠন সম্প্রসারণ ও গণভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে শতভাগ উপজেলা পৌরসভা এবং ইউনিয়নে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের সকল ওয়ার্ডে এবং ইউনিয়নের ১০% ওয়ার্ডকে উপশাখা মানের ও বাকিগুলোতে সমর্থক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা।

২.১.৭. সংগঠন সম্প্রসারণ ও মজবুতিকরণের লক্ষ্যে থানা, ওয়ার্ড/ইউনিয়ন ও উপশাখার তত্ত্বাবধায়কগণ তত্ত্বাবধানকৃত এলাকায় পরিকল্পিত সময়দান এবং বেইজ এরিয়া সংশ্লিষ্ট থানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সফর করার চেষ্টা করবেন।


উপশাখার কিছু উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি

* কুরআন তালিম

* সামষ্টিক পাঠ

* চা-চক্র

* সাপ্তাহিক সাধারণ সভা

* মাসিক সাধারণ সভা

* কর্মী বৈঠক

* সমর্থক শিক্ষাবৈঠক

* সাধারণ জ্ঞানের আসর

* গ্রুপ দাওয়াতি কাজ


শেষ কথা

আমাদের আদর্শের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন সম্প্রসারণ ও মজবুতি অর্জনের বিকল্প নেই। কেন্দ্রীয় সংগঠন অধিকাংশ ক্ষেত্রে পলিসি উদ্ভাবনের কাজ করে থাকে। মাঠ পর্যায়ে উপশাখা সংগঠনই কেন্দ্রের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে থাকে। তাই সংগঠনের উপশাখা যত বেশি শক্তিশালী ও মজবুত হবে সংগঠন তত বেশি শক্তিশালী ও মজবুত হবে। করো না মহামারি পরবর্তী সময়ে উপশাখা পর্যায়ে কাজ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

উপশাখার প্রোগ্রাম এবং উপশাখার অন্যান্য কার‌্যাবলি শতভাগ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝে মোবাইল, অনলাইন এবং মাদকাসক্তি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের আদর্শিক মূল্যবোধ ও ইসলামী অনুশাসনে আগ্রহী করে তুলতে উপশাখা দায়িত্বশীলদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দায়িত্বশীলদের জ্ঞানগত ও আমলগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। উপশাখার কাজগুলো আদর্শ মানে উন্নীত করার মাধ্যমে আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন হবে, ইনশাআল্লাহ।

Monday, March 2, 2026

যে ছবি চেতনার, প্রেরণার ও সাহসের...


যে ছবি চেতনার, প্রেরণার ও সাহসের...

দিনটি ছিল ০৯ নভেম্বর ২০২১। তখন আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সোনাগাজী সাথীশাখা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।


সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ খবর পেলাম- মহিলা জামায়াতের একটি প্রোগ্রামে পুলিশ ঘিরে রেখেছে। জানতে পারলাম, জেলা এবং উপজেলা মহিলা জামায়াতের নেতৃবৃন্দের সাথে আম্মুও সেই প্রোগ্রামে উপস্থিত আছেন।

পুলিশের বহু নাটকীয়তার পর উনাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো সোনাগাজী মডেল থানায়। সাজানো হলো নাটকের প্লট, গ্রেফতার দেখানো হলো 'বিশেষ ক্ষমতা আইনে'।

সেদিন সারারাত সবাই হাজতে নির্ঘুম বসে ছিলেন। আবদুল মোমেন সাহেদ ভাই সহ আমরা থানার ভিতরে যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস ও খাবার পৌঁছে দিই। বাইরে অপেক্ষা করছিলাম আর খোঁজ খবর রাখছিলাম কোনো কিছু প্রয়োজন হয় কিনা।

যদিও আমার থানার ভিতরে যাওয়া নিষেধ ছিলো, কিন্তু সেদিন মন মানেনি। ভিতরে গিয়ে আম্মুদের সাথে দেখা করে আসলাম। তারা একটুও বিচলিত ছিলেন না, তাদের মধ্যে কোনো ভয় দেখিনি সেদিন। বরং সেদিন শহীদ মোস্তাফিজের বোন(আম্মু) সহ আন্টিদের মাঝে ঈমানের এক অদ্ভুত দৃঢ়তা লক্ষ করেছিলাম।

পরদিন সকাল ১০টায় যথারীতি কোর্টে চালান করার জন্য যখন বের হচ্ছিলেন তখন এই ছবিটি তুলি। তারপর কোর্টে জামিন আবেদন করা হলে তা নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয় ক্যাঙ্গারু কোর্ট। অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ মহিলাদের কোনো কথাই শোনা হয়নি সেদিন। গ্রেফতারকৃত সকল মহিলাদের স্বামীদেরও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

ইঞ্জিনিয়ার ফখরুদ্দিন নানা সেদিন ফেইসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন-
"স্ত্রী কারাগারে, স্বামী পলাতক। এই হলো সংসার! ছেলেমেয়েরা কি করবে?"

নির্যাতনের মাত্রা শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, সেই সময়ে ফেনী জেলা কারাগারে সাক্ষাৎ বন্ধ ছিলো। স্বজনদের সাথে স্বাভাবিক সাক্ষাতের যে অধিকার তা থেকে বঞ্চিত করেছিলো হাসিনার ফ্যাসিস্ট প্রশাসন। পুরো দেড় মাসে মাত্র একদিন সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলাম কামাল ভাইয়ের সহযোগিতায়।

আম্মু সেদিন স্বাভাবিক ভাবেই সবার খোঁজখবর নিলেন। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকায় একটুও বিচলিত ছিলেন না। নিজের সাংগঠনিক কাজ, আব্বু ও ছোটভাই-বোনদের খেয়াল রাখার বিষয়ে বললেন। চিন্তা করতে নিষেধ করলেন।

দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশী সময় ধরে এই কনকনে শীতের মধ্যে অসুস্থ বয়োবৃদ্ধ মহিলাদের উপর অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন আল্লাহর আরশকে প্রকম্পিত করেছিলো। কারাগারে থেকে প্রায় সকলেই তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

আমাদের মায়েদের উপর চলা এই অবর্ণনীয় অত্যাচারের বদৌলতে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন তার দ্বীনকে এই জমীনে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ইনশাআল্লাহ।

- ইমাম হোসেন আরমান | ১০ নভেম্বর ২০২৫, ফেনী

Thursday, February 26, 2026

ইসলামী ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার ২০২৬ সেশনের সেটআপ সম্পন্ন

২০২৬ সেশনের সভাপতি হিসেবে ইমাম হোসেন আরমান ও সেক্রেটারি হিসেবে আশ্রাফুল হক সোহেলের নাম ঘোষণা করেন।


বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার ২০২৬ সেশনের জন্য সেটআপ সম্পন্ন হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।

আজ ২৬শে ফেব্রুয়ারী বিকাল ৪টায় ফেনী জেলা শাখার সদ্য সাবেক সভাপতি আবু হানিফ হেলালের সভাপতিত্বে ফেনী দারুল ইসলাম সোসাইটি মিলনায়তনে জরুরি সদস্য সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক হেলাল উদ্দিন রুবেল। জেলা শাখার সদস্যদের গোপন ব্যালটে প্রদত্ত পরামর্শের আলোকে জেলা সভাপতি ও সেক্রেটারি নাম ঘোষণা করেন তিনি। ২০২৬ সেশনের সভাপতি হিসেবে ইমাম হোসেন আরমান ও সেক্রেটারি হিসেবে আশ্রাফুল হক সোহেলের নাম ঘোষণা করেন।

এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামী ফেনী জেলা আমীর মুফতি আব্দুল হান্নান, জেলা সেক্রেটারি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি মাও. আব্দুর রহিম, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও ফেনী শহর সভাপতি হাফেজ মাজহারুল ইসলাম, সাবেক জেলা সেক্রেটারি আ.ন.ম. আব্দুর রহিম, সাবেক জেলা সভাপতি ফারুক আহমেদ আজাদ, নাজিম উদ্দিন, ইমাম হোসেন এবং সদ্য সাবেক সভাপতি আবু হানিফ হেলাল।

পরবর্তীতে দোয়া ও মুনাজাত এবং ইফতারের মধ্য দিয়ে প্রোগ্রামের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়।

Saturday, October 11, 2025

প্রচার বিমুখ এক বিরল ব্যক্তিত্ব || মরহুম অধ্যাপক এ.কে.এম. নাজির আহমদ



লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে ছাত্র, শিক্ষক তথা সর্বস্তরের মানুষের চিন্তার পরিশুদ্ধি ঘটানোই যার যাবতীয় কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য, দুনিয়ার লোভনীয় বৈষয়িক আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে যিনি সদা সচেষ্ট, কুরআন হাদীস তথা ইসলামী সাহিত্যে যার রয়েছে গভীর পান্ডিত্য, যিনি দুনিয়ার ঝামেলায় মোটেই নিজেকে জড়াতে চান না, প্রতিনিয়ত যিনি নিজেকে গর্হিত কাজ থেকে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করেন এবং আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, কথা ও কাজে মিল রেখে জীবনযাপন করছেন তিনি হলেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক নাজির আহমদ।

পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করে যারা নির্লোভ, নিরহংকার, গোপনে থেকে আল্লাহ প্রদত্ত মেধা, যোগ্যতা, সততা ও শ্রম দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের এই বাগানকে গড়ার কাজেই রত থাকেন। তেমনি একজন ক্ষণজন্মা ইসলামী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক একেএম নাজির আহমেদ।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েল ডিপার্টমেন্টের সেরা ছাত্র ছিলেন তিনি। ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক সম্ভাবনার হাত ছানিকে বাদ দিয়ে আমৃত্যু ইসলামী আন্দোলনের খেদমতে নিজের জীবনকে বিলীন করে দিয়েছেন এই মহান প্রাণপুরুষ। নিজের মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, লেখনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে এক ব্যতিক্রম অধ্যায় রচনা করেছিলেন তিনি। পরিচ্ছন্ন চিন্তা, রাসূল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ, শিরক এবং বিদআত মুক্ত জীবন-যাপনে তিনি ছিলেন অনড়।

তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রিয় সভাপতি ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি একাধারে একজন সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, লেখক বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি ও অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে নির্লোভ, পরোপোকারী, সদা হাস্যোজ্জল ইসলামী আন্দোলনের এক অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন।

ইসলামী আন্দোলনের এই প্রাণপ্রিয় আধ্যাত্মিক নেতা ২০১৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠার ২ জানুয়ারি ২০১৪ সালে তিনি দ্বিতীয় দফা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকেন। পরে ৭ জানুয়ারি ২০১৪ সালে তিনি রাত ১১ টা ১০ মিনিটে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি স্ত্রী, ৩ পুত্র, ২ কন্যা ও অসংখ্য আত্নীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে যান।

জন্ম ও শিক্ষাঃ অধ্যাপক একেএম নাজির আহমদ ১৯৩৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার বরুড়া থানার অন্তর্গত আড্ডা ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম- ওমর আলী ভূঁঞা এবং মাতার নাম- গোলাপ জাহান। তিনি নিজ গ্রামে পিতৃগৃহে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর স্থানীয় আড্ডা হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। বরাবরই তিনি ক্লাসে প্রথম হতেন। ১৯৫৭ সালে প্রথম বিভাগেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর ১৯৫৯ সাওে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমেডিয়েট পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ. অনার্স ও ৬৩ সালে কৃতিত্বের সাথে এম.এ. পাস করেন। তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল ল’ কলেজে আইন বিভাগে অধ্যয়ন করেন।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি একজন U.O.T.C ক্যাডেট ছিলেন। একবার পুরো ব্যাটেলিয়ান থেকে ৩৩ জন চৌকস ক্যাডেটকে বাছাই করা হয়। তিনি ছিলেন তাদের একজন।

ছাত্র ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন: সমাজের মাঝে ইসলামের সুমহান আদর্শ পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি অগ্রভাগে থেকে ভূমিকা পালন করেছেন। নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন ছাত্রনেতা তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রিয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি মুসলিম ছাত্র মজলিসের সভাপতি এ.কে.এম. হাবীবুর রহমান ও জেনারেল সেক্রেটারী শাহ আবদুল হান্নানের নিকট ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পান। অতঃপর অধ্যাপক সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী সাহেবের সংস্পর্শে আসেন। উল্লেখ্য সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী তদানিন্তন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। উল্লেখ্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তার জীবনে সাইয়্যেদ সাহেব এক বিরাট প্রভাব ফেলেন এবং চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। মূলত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী ছিলেন তার ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের শিক্ষাগুরু। প্রথমতঃ তিনি ১৯৬০ সালে মুসলিম ছাত্র মজলিসে যোগদান করেন, পরে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোদ দেন। ‘৬২ সালে ছাত্র সংঘের সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ছাত্র অঙ্গনে ইসলামী আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র হিসাবে আইন শাস্ত্র অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন। ১৯৬৫ সালের শেষ দিকে বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং’৬৬ সালেই সদস্য পদ লাভ করেন। অতপর ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর কুমিল্লা জিলার আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি শুধু মাত্র জামায়াতের রুকুনিয়াত রক্ষার জন্য কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের চাকুরী থেকে ইস্তফা দেন। পরে কুমিল্লা কলেজে অধ্যাপনা করেন।

কর্মজীবনঃ বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর তিনি নিজেকে আবার শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করেন এবং ’৭৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেন। কর্মজীবনে তিনি লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা কলেজ ও আবুজার গিফারী কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৯ সালের শেষভাগে ইসলামী গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন এবং ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে সুষ্ঠুভাবে উক্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

সাংগঠনিক জীবন: তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নায়েবে আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য। ১৯৬০ সালে ছাত্র জীবনেই ইসলামী আন্দোলনে জড়িত হন। তিনি ১৯৬৫ সাল থেকেই জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালে কুমিল্লা জেলা জামায়াতের আমীর নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সর্বশেষে ২০০৯ সাল থেকে নায়েবে আমীর হিসেবে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে বরুড়া থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রচার বিমুখ ব্যক্তি, বর্হিমুখী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজের চেয়ে আদর্শ মানুষ গড়ার কাজে স্বীয় চিন্তা ও যাবতীয় কর্মকান্ডে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন বেশী।

ইসলামী আন্দোলনের কঠিন সময়ে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আওয়ামী সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যখন কারাগারে বাকী নেতৃবৃন্দ যখন মামলা-হামলার কারণে প্রকাশ্য ময়দানে আসতে পারছে না তখন মাঠে থেকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সম্মানে ইফতার মাহফিল, কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার মাহফিল ও বিভিন্ন কর্মকান্ডে জামায়াতে ইসলামী মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বক্তব্যের ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত, প্রচন্ড শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত ও নেতা-কর্মীদের জন্য প্রেরণাদায়ক।

গ্রেফতারঃ ইসলামী আন্দোলনের অন্য শীর্ষ নেতাদের মতো তিনিও এ জালিম সরকারের গ্রেফতারের রোষানল থেকে রেহাই পাননি। গ্রেফতারের পর এই বয়ো:বৃদ্ধ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইসলামী ব্যক্তিত্বকেও পুলিশি রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সকল জুলুম-নির্যাতনের মোকাবেলায়ও তিনি ছিলেন অটল এবং অবিচল। তার গোটা জীবনে ছিলো সহজ-সরল, সাদামাটা তিনি ছিলেন সত্যিই একজন সফল নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি।

মূলত: তাঁর প্রিয়ভাজন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদাতের ঘটনা তাঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ সৃষ্টি হয়।

সাহিত্য কর্মঃ মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তন করে আদর্শ ও চরিত্রবান মানুষ গড়ার লক্ষ্যে তিনি অনকগুলো বই লিখেছেন। অধ্যাপক একেএম নাজির আহমদ ইসলামী সাহিত্যের অনবদ্য ভান্ডার গড়ে তুলেছেন। বড় বড় ইতিহাস ও জ্ঞানগর্ভ বিষয়সমূহ তিনি অতি সংক্ষেপে লিখেছেন। এটা তার বিরাট কৃতিত্ব যে, তিনি অতি বড় জিনিসও সংক্ষেপে পেশ করতে ও লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন। তাঁর লিখিত বইগুলো পড়লেই তা সহজে বুঝা যায়। বইগুলো হৃদয়গ্রাহী এবং চিন্তার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক ও উপযোগী। তাঁর ছোট ছোট বিষয় ভিত্তিক বইগুলো পাঠকদের কাছে শিক্ষকের মত ভূমিকা রাখে। ছোট-বড় মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তাঁর লিখিত বই সংখ্যা ৩৬টি। তাঁর লিখিত বই সারা বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের পাঠকদের কাছে সমাদৃত। পাশাপাশি তিনি হাদীসগ্রন্থ, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, আবু দাউদ শরিফ, নাসাঈ শরীফ ও রিয়াদুস সালেহীন সহ বিভিন্ন উৎস গ্রন্থ বিশুদ্ধ বাংলায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর অনুবাদ ইসলামী সাহিত্যাঙ্গনকে করেছে সমৃদ্ধ। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বই হলো- আল্লাহর দিকে আহবান, ইসলামী সংগঠন, আদর্শ মানব মুহাম্মদ (সা.), মহানবীর মহান আন্দোলন, যুগে যুগে ইসলামী জাগরণ, ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃত, বাংলাদেশের ইসলামের আগমন, আল্লাহর পরিচয়, দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, দ্বীন প্রতিষ্ঠার সঠিক পদ্ধতি, ইসলামের সোনালী যুগ, উসমানী খিলাফতের ইতিহাস ও সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী। এছাড়া তিনি বেশ কিছু বই অনুবাদ করেছেন।- কালজয়ী আদর্শ ইসলাম (সাইয়েদ কুতুব), অনাগত মানব সভ্যতা ও ইসলাম (সাইয়েদ কুতুব), পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎস (আবদুল হামীদ সিদ্দিকী), ইসলামী শিক্ষার মূলনীতি (অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ) ইত্যাদি। এদিকে তিনি ইসলামিক সেন্টারের গবেষণা সেলের মাধ্যমে সমসাময়িক বিষয়ের উপর দেশে খ্যাতনাম লেখক ও বুদ্ধিজীবিদের সমন্বয়ে অসংখ্য গবেষণা পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। দেশে-বিদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে পুরাতন ও ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণা পত্রিকা ‘মাসিক পৃথিবী’ সর্বাধিক প্রচারিত ও সমাদৃত। ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘কলম’ তাঁর অবদানের সাক্ষর হয়ে আছে। শিশু সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সব মিলিয়ে তাঁর লিখিত মৌলিক গ্রন্থ-পুস্তিকা প্রায় শতাধিক।


অধ্যাপক এ.কে.এম. নাজির আহমদ রচিত গ্রন্থাবলী

১. আল্লাহর দিকে আহবান

২. মহানবীর (সা) মহান আন্দোলন

৩. ইসলামের সোনালী যুগ

৪. ইসলামী সংগঠন

৫. সৃষ্টি ও দৃষ্টিকোণ

৬. পুরুষ ও মহিলাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্র

৭. আদর্শ শিক্ষক

৮. বাংলাদেশে ইসলামের আগমন

৯. ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নতি

১০. বর্তমান সভ্যতার সংকট

১১. আল্লাহর পরিচয়

১২. আল্লাহর পরিচয় ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস

১৩. ইসলামী বিপ্লবের স্বাভাবিক পদ্ধতি

১৪. যুগে যুগে ইসলামী জাগরণ

১৫. বসনিয়া হারজেগোভিনার ইতিকথা

১৬. ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি

১৭. সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী

১৮. উসমানী খিলাফতের ইতিকথা

১৯. ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃত

২০. আদর্শ মানব মুহাম্মদ (সা)

২১. ইসলামের দৃষ্টিতে ভাল ব্যবহার

২২. সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী

২৩. সূরাহ আল বাকারা (আয়াত ও অনুবাদ) -প্রকাশিতব্য


অনুবাদ গ্রন্থ

১. কালজয়ী আদর্শ ইসলাম

২. পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎস

৩. আগামী দিনের জীবন বিধান

৪. ইসলামী শিক্ষার মূলনীতি


পাঠ্য পুস্তক

১. বাংলা পড়া-১

২. বাংলা পড়া-২

৩. A Childs English

৪. English Lessons Book-1

৫. English Lessons Book-2

৬. বাংলা ব্যাকরণ ও প্রবন্ধ রচনা-১ম খ-

৭. বাংলা ব্যাকরণ ও প্রবন্ধ রচনা-২য় খ-।


ইসলামী আন্দোলনের এই মহান দিকপাল তাঁর রচিত সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের মাঝে জাগরুক থাকবেন শতাব্দী থেকে শতাব্দীকাল। মুসলিম উম্মাহর জন্য তিনি হয়ে থাকবেন প্রেরণার বাতিঘর।

আল্লাহভীরু নেতা জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য আঞ্জাম দিয়েছিলেন অক্ষরে-অক্ষরে। তাঁর দারসুল কুরআন এবং আসহাবে রাসূলের জীবনের উপরে আলোচনা সত্যিই ছিল ব্যতিক্রম। জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ অনেকেই ছিলেন তাঁরই হাতে গড়া মানুষ। আনুগত্যের পরম পরাকাষ্ঠা হয়ে তিনি জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ভূমিকা পালন করে গেছেন অনেকটাই নিরবে নিভৃতে।

সমাজ সেবাঃ তিনি ঢাকাস্থ ইসলামিক এডুকেশন সোসাইট ও বরুড়া আলফালাহ সোসাইটির চেয়ারম্যান এবং কুমিল্লা ইবনে তাইমিয়া ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

দেশ ভ্রমণঃ এ পর্যন্ত তিনি ১৪টি দেশ সফর করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে যোগদান করে বক্তব্য প্রদান করেছেন। বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও প-িত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মতবিনিময় করেছেন। তিনি ১৯৯৫ সালে হজ্বব্রত পালন করেন। উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালী, পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব-আমীরাত, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ সফর করেন।

বৈবাহিক জীবনঃ ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর বরুড়া থানার অর্জুনতলার মিঞা বাড়ীতে তিনি বিবাহ করেন। তার স্ত্রীর নাম মনোয়ারা বেগম। তাদের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে।

Tuesday, September 23, 2025

খেলাফত প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ : শরীয়াহ ও আধুনিক ইসলামী রাজনীতি বিশ্লেষণ || মাওলানা ইমাম হোসাইন


আধুনিক ইসলামী রাজনীতির তত্ত্বকে বাতিল বলে যারা খেলাফতের স্লোগান তুলছে—কথিত হারুন ইজহার, ত্বহা কিংবা আসিফ আদনান—বাস্তবে এরা একধরনের বর্ণচোরা ছাড়া কিছু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি এরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার কোনো কার্যক্রম জাতির সামনে উপস্থাপন করছে, নাকি কেবল একটি স্লোগান তুলে আধুনিক ইসলামী রাজনীতিকে বাতিল ঘোষণা করে জাতিকে ধোঁকা দিচ্ছে?

মূলত, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমত সমস্ত আলেমদের ঐকমত্যে একটি শূরা গঠন করা প্রয়োজন। সেই শূরার অধীনে একজন খলিফা বা আমীর নির্বাচিত হবেন। এরপর তিনি শূরার পরামর্শে মুসলিম জাতির কাছে তার পক্ষ থেকে বাইয়াত (আনুগত্য) গ্রহণের আহ্বান জানাবেন। যখন রাষ্ট্রের সকল স্তরে মুসলিমরা তার আনুগত্য স্বীকার করবে, তখন তিনি সেই রাষ্ট্রের খলিফা হবেন।

এই প্রক্রিয়ায় খেলাফতের আমীর বাইয়াতের আহ্বান জানানোর সাথে সাথেই বিদ্যমান অন্য সকল সরকার ও শাসনব্যবস্থা বাতিল বলে গণ্য হবে। আর তার বিরোধিতা করা মানে হবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা বৈধ। তবে শরীয়াহর মাসআলা অনুযায়ী, যদি কারো যুদ্ধ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত শক্তি না থাকে, তবে প্রতিষ্ঠিত সরকার জালিম হলেও তার আনুগত্য করতে হবে। (এটাই শরীয়াহর পদ্ধতি)।

আধুনিক রাজনীতিতে ইসলাম বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার নিয়মও প্রায় একই রকম। রাষ্ট্রের অধীনে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে। সেই দল জনগণের কাছে ইসলামী শরীয়াহ ও মূল্যবোধের পক্ষে জনমত তৈরি করবে। রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণ যখন ইসলামী দলকে সমর্থন দেবে, তখন তারা জনগণের পরোক্ষ সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার গঠন করবে। আর সেই সরকারের প্রধান, আইনসভার সদস্যদের পরামর্শে, রাষ্ট্রের মৌলনীতি ইসলামী মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠা করবে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

শরীয়াহর মাসআলায় যেমন বলা হয়েছে—শক্তি না থাকলে জালিম সরকার হলেও আনুগত্য করতে হবে—তার আধুনিক রূপই হলো গণতন্ত্র। এখন এই গণতন্ত্রকে এক কথায় পরিবর্তন করতে চাইলে যুদ্ধ করতে হবে। আর যদি যুদ্ধ করার শক্তি না থাকে, তবে গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। ইসলামী দলগুলো এ নীতির আলোকে গণতন্ত্রের কাঠামো ব্যবহার করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে।

উপরোক্ত দুটি পদ্ধতির মধ্যে প্রায় ৯০% মিল রয়েছে। সামগ্রিকভাবে খুব বেশি পার্থক্য নেই। বরং প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টি বর্তমান বিশ্বে অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু আমাদের দেশের তথাকথিত "খেলাফত স্লোগানদাতা"রা না প্রথম পদ্ধতিতে কোনো কাজ করছে, না দ্বিতীয় পদ্ধতিতে। বরং যেসব ইসলামী দল দাওয়াহ ও কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজ করছে এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করছে, তাদের কোনো রোডম্যাপ না দিয়েই এরা ইসলামী রাজনীতিকে হারাম ঘোষণা করছে। এটি নিঃসন্দেহে একধরনের বর্ণচোরা আচরণ।

তাদের নেই খেলাফত প্রতিষ্ঠার কোনো কর্মসূচি, নেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো রূপরেখা। বরং তারা এক একজন পশ্চিমা এজেন্ডার বাহক ছাড়া কিছুই নয়।

ভোট না দেওয়ার যে যুক্তি এরা সামনে আনে, সেটিই আগামীকাল আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য বড় দায় হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, তাদের এ যুক্তিতে উৎসাহিত হয়ে মুসলিমরা যদি ভোট না দেয়, আর সেই কারণে কোনো জালিম শাসক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার এদের ওপরই বর্তাবে।

লেখক:
মাওলানা ইমাম হোসাইন 
শিক্ষক | লেখক | গবেষক 

Friday, August 22, 2025

বইনোট : শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামী রূপরেখা | অধ্যাপক গোলাম আযম (রাহি.)

বইনোট : শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামী রূপরেখা | অধ্যাপক গোলাম আযম (রাহি.)

১) ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট

১৯৫৬–৬১ সালে পাকিস্তানের শিক্ষা কমিশনকে ঘিরে লেখকের গবেষণা ও প্রবন্ধ থেকে বইটির সূত্রপাত। বারবার আলোচনা ও পরিমার্জনের পর এটি ২০০৪ সালে প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়। লেখকের অভিযোগ, নীতিমালায় নৈতিকতা ও ইসলামী চেতনা অনুপস্থিত।

সারাংশ: বইটি দীর্ঘ আলোচনার ফসল; মূল সমস্যা—ইসলামী ভিত্তির অভাব।


২) বইয়ের উদ্দেশ্য

বাংলাদেশে শিক্ষা দুই মেরুতে—মাদ্রাসা বনাম আধুনিক শিক্ষা। কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়। বইটির উদ্দেশ্য: ইসলামী আদর্শে ভিত্তিকৃত সমন্বিত শিক্ষার রূপরেখা দেওয়া।

সারাংশ: সমন্বিত ইসলামী-আধুনিক শিক্ষা দরকার।


৩) চারটি মৌলিক প্রশ্ন

শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে আগে নির্ধারণ করতে হবে:

১) শিক্ষা কী?

২) মানুষ কে?

৩) জাতীয় আদর্শ কী?

৪) বিদ্যমান শিক্ষার সমস্যা কোথায়?

সারাংশ: কাঠামোর আগে দর্শন জরুরী


৪) শিক্ষা কী

শিক্ষা হলো—“পরিকল্পিত ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে গুণাবলি ও জ্ঞান বিকাশ।” অন্য প্রাণীরা স্বভাবত শিখে, কিন্তু মানুষের জন্য কৃত্রিম/সচেতন আয়োজন দরকার।

সারাংশ: শিক্ষা = পরিকল্পিত মানবিক বিকাশ।


৫) মানুষ কে?

মানুষ দেহ–আত্মার সমন্বয়ে গঠিত নৈতিক জীব। শুধু জ্ঞান বা প্রযুক্তি নয়, নৈতিকতা ছাড়া শিক্ষা ব্যর্থ। দেহ বাহন, আত্মা পরিচালক।

সারাংশ: মানুষ নৈতিক-সত্তা, দেহ–আত্মা ভারসাম্য জরুরি।


৬) দেহ–আত্মার দ্বন্দ্ব

শুধু ভোগবাদ (দেহ) বা শুধু বৈরাগ্য (আত্মা) অমানবিক। ইসলাম মধ্যপথ নির্দেশ করে—প্রবৃত্তি ও বিবেকের সমন্বয়।

সারাংশ: শিক্ষা হবে প্রবৃত্তি–বিবেকের ভারসাম্যপূর্ণ।


৭) মানুষের উপযোগী শিক্ষা

কেবল ভৌত বা কেবল আধ্যাত্মিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। নৈতিক সীমার ভেতরে আধুনিক জ্ঞান প্রয়োগ করতে শেখায় এমন শিক্ষাই সঠিক।

সারাংশ: উপযোগী শিক্ষা = নৈতিকতা + জ্ঞান।


৮) জাতীয় আদর্শ ও শিক্ষা

প্রতিটি রাষ্ট্র শিক্ষায় নিজস্ব আদর্শ প্রতিফলিত করে। আদর্শ ছাড়া শিক্ষা অর্থহীন।

সারাংশ: শিক্ষা গড়ে আদর্শের মানুষ।


৯) বাংলাদেশের জাতীয় আদর্শ—ইসলাম

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাস, সংবিধান ও জনমত অনুযায়ী জাতীয় আদর্শ ইসলাম। সেক্যুলার ধারাকে জনগণ ও আইন প্রত্যাখ্যান করেছে।

সারাংশ: জাতীয় আদর্শ ইসলাম।


১০) শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য

ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তোলা নাগরিক, যারা আধুনিক জ্ঞানে দক্ষ হবে।

সারাংশ: আধুনিক দক্ষতা + ইসলামী নৈতিকতা।


১১) প্রধান অন্তরায়: দ্বিমুখী শিক্ষা

মাদ্রাসায় আধুনিক জ্ঞানের ঘাটতি, আধুনিক ধারায় ইসলামী চেতনার ঘাটতি। সমাধান: মেলবন্ধন।

সারাংশ: বিভক্ত শিক্ষা একতা ভাঙে।


১২) সংস্কারচেষ্টার সীমাবদ্ধতা

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—বিভিন্ন কমিশন ধর্মকে কেবল “বিষয়” বানিয়েছে, পূর্ণ দর্শন নয়। ফলে বাস্তবায়ন হয়নি।

সারাংশ: কমিশন রিপোর্ট আছে, পরিবর্তন হয়নি।


১৩) আধুনিক শিক্ষার গলদ

পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জ্ঞান শেখানো হয়, পরে দীনিয়াত যোগ করলে তা বেমানান লাগে।

সারাংশ: সেক্যুলার কোর + ধর্মীয় অ্যাড-অন = দ্বিধা।


১৪) ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কী চায়?

শুধু নামাজ–রোজা নয়; অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান—সবকিছুতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত শিক্ষা।

সারাংশ: ইসলাম = পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা


১৫) ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

১) দীন–দুনিয়া মিলিত।

২) সব জ্ঞান ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে।

৩) ইসলামী পরিবেশ।

৪) উচ্চশিক্ষায় তুলনামূলক শ্রেষ্ঠতা।

৫) কুরআন–হাদিস–ফিকহে দক্ষতা।

সারাংশ: বিষয়বস্তু + পরিবেশ + উৎসে দক্ষতা।


১৬) বাস্তব রূপ (ক) দীন–দুনিয়া একীভূত

ধর্মীয়–পার্থিব আলাদা নয়। সব কাজ ইসলামী সীমায় হলে ইবাদত।

সারাংশ: শিক্ষা-জীবন একক ব্যবস্থা।


১৭) বাস্তব রূপ (খ) পরোক্ষ পদ্ধতি

শিক্ষায় সরাসরি নীতিশিক্ষা নয়; বিষয়ভিত্তিক উদাহরণে ইসলামী নীতি শেখানো। যেমন: সুদের অঙ্ককে যুলুম হিসেবে উপস্থাপন।

সারাংশ: বিষয়ভিত্তিক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি।


১৮) বাস্তব রূপ (গ) পরিবেশ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামাজ, পর্দা, নৈতিকতা—এসব অনুশীলন থাকতে হবে।

সারাংশ: পরিবেশ গড়ে চরিত্র।


১৯) বাস্তব রূপ (ঘ) উচ্চশিক্ষা

উচ্চশিক্ষায় ইসলামী বনাম পাশ্চাত্য দর্শনের তুলনা—ইসলামের যুক্তিগত শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করা।

সারাংশ: উচ্চশিক্ষায় ইসলামী কোর অপরিহার্য।


২০) উৎসে দক্ষতা

কুরআন–হাদিস–ফিকহে গভীর জ্ঞান থাকা জরুরি।

সারাংশ: উৎসে দক্ষতা ছাড়া শিক্ষার গভীরতা আসে না।


২১) শিক্ষকের ভূমিকা

শিক্ষকই আদর্শ। বইয়ের চেয়ে শিক্ষকের চরিত্র বড়।

সারাংশ: শিক্ষকই আসল কারিকুলাম।


২২) আধুনিক শিক্ষা-বিজ্ঞান ব্যবহার

আধুনিক টুলস (টেকনোলজি, গবেষণা) ইসলামী শিক্ষায় কাজে লাগাতে হবে।

সারাংশ: আধুনিক টুলস ইসলামী নীতিতে কাজে লাগান।


২৩) উপসংহার

পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সম্ভব, তবে ছোট ছোট মডেল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। “ইসলামই বাঁচিয়েছে, ইসলামই বাঁচাবে”—এই আশাবাদে সমাপ্তি।

সারাংশ: ছোট মডেল থেকে জাতীয় রূপায়ণ।


পুরো বইয়ের সামারি:

সমস্যা: দ্বিমুখী শিক্ষা ও আদর্শশূন্য দৃষ্টি।

সমাধান: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে দীন–দুনিয়া একীভূত শিক্ষা, পরিবেশ-নির্ভর চরিত্রগঠন, উৎসে দক্ষতা ও আধুনিক টুলসের সৃজনশীল ব্যবহার।


সংকলনে: আরমানের খেরোখাতা

Monday, May 5, 2025

বালাকোটের চেতনা; অতীতের শিক্ষা; আগামীর প্রেরণা || ০৬ মে ঐতিহাসিক বালাকোট দিবস

বালাকোটের চেতনা; অতীতের শিক্ষা; আগামীর প্রেরণা || ০৬ মে ঐতিহাসিক বালাকোট দিবস

•ভূমিকা: 
ইতিহাসের পাতাজুড়ে সত্য ও স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের বহু গৌরবগাথা রচিত হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুদ্ধ বদর থেকে শুরু করে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর দীর্ঘ রক্তস্নাত সংগ্রামের উদাহরণ রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসেও তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বালাকোটের যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে স্বাধীনতা আন্দোলন। ১৮৩১ সালের ৬ মে বালাকোটের প্রান্তরে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর নেতৃত্বে ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্বাধীনতার চেতনা একসূত্রে গাঁথা হয়েছিল। এই অসমযুদ্ধে উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রেরণাদায়ী নেতা শাহ সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.) তাঁর সাহসী সহযোদ্ধাদের নিয়ে যে শাহাদাতের নজরানা পেশ করেছিলেন, তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। এই গৌরবময় স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে বিশ্বব্যাপী ৬ মে দিনটিকে "বালাকোট দিবস" হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরও প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দিনটি পালন করে থাকে। বালাকোটের শহীদদের সেই ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ ভারতীয় মুসলমানদের আজাদী আন্দোলনে নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছিল, যার মাধ্যমে তারা একটি স্বাধীন আবাসভূমি লাভের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

•বালাকোটের ঐতিহাসিক পটভূমি:

উত্তর-পশ্চিম ব্রিটিশ ভারতের একটি ছোট্ট পাহাড়ি শহর বালাকোট, যা আজকের পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখাওয়ার মেনশেহরা জেলার কাগান উপত্যকার প্রবেশপথে অবস্থিত। আঠারো শতকের শেষ দিকে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও আফগান দুররানি শাসনের দুর্বলতার সুযোগে, শিখ সাম্রাজ্যের মহারাজা রঞ্জিত সিং পাঞ্জাবসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১৮ সালে শিখ বাহিনী পেশোয়ার দখল করে নেয়, যার ফলে সেই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠী শিখ শাসনের অধীনে চলে আসে। শিখ শাসকদের অধীনে মুসলমানরা তখন জুমার নামাজ, আজান, কুরবানি, এমনকি ধর্মীয় পোশাক পরিধানেও বিধিনিষেধের মুখোমুখি হন। এই অবমাননাকর অবস্থা মুসলমানদের মনে তীব্র কষ্ট ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকার অনেক মুসলিম সরদার ও খান নিজেদের জীবন ও ধর্ম রক্ষার জন্য দিল্লির একজন প্রখ্যাত ইসলামী নেতা সৈয়দ আহমদ বেরলভীর শরণাপন্ন হন। একই সময় ভারতজুড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদও তার কর্তৃত্ব বিস্তার করছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ইসলামী পরিচয় বজায় রাখা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার করার তাগিদ তীব্র হয়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ভারতবর্ষজুড়ে শুরু হয় একটি অখণ্ড ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আজাদী আন্দোলন। এই ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নেতৃত্ব দেন সৈয়দ আহমদ বেরলভী (১৭৮৬-১৮৩১) - ভারতের এক খ্যাতনামা ইসলামী চিন্তাবিদ, সংস্কারক ও সামরিক নেতা।

•সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর জীবন ও আন্দোলনের বিস্তৃত পটভূমি:


সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ১৭৮৬ সালে এলাহাবাদের রায়বেরেলভী নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলমুল্লাহর ইন্তেকালের পর তিনি শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দিল্লি যান এবং বিখ্যাত আলেম শাহ আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একসময় টঙ্কের নবাব আমীর খানের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু যখন আমীর খান ইংরেজদের সাথে আপস করেন সৈয়দ আহমদ বেরলভী সেই আপসের বিরোধিতা করে সৈন্যদল ত্যাগ করেন এবং স্বাধীন ধর্মভিত্তিক আন্দোলনের পথে যাত্রা শুরু করেন। ১৮১৮ সালে দিল্লি ফিরে এসে তিনি প্রায় দুই বছর ধরে রোহিলখণ্ড, আগ্রা, মিরাট, মুজাফফরনগর, সাহারানপুর, লক্ষ্ণৌ, বেনারসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংস্কার ও ইসলামী জাগরণমূলক বক্তৃতা প্রদান করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের গভীরতা এমন ছিল যে, বহু বিখ্যাত আলেম তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন।

১৮২১ সালে তিনি প্রায় ৪০০ ভক্তসহ হজের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন, যেখানে উপমহাদেশের বহু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এ সময় বাংলার সাহসী নেতা সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর তাঁর সান্নিধ্যে আসেন এবং অনুপ্রাণিত হয়ে দেশে ফিরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে সৈয়দ আহমদের প্রভাব উপমহাদেশজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সময় হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলন এবং তিতুমীরের স্বাধীনতা সংগ্রাম সমান্তরালে চলছিল, যা মুসলমানদের একসাথে জাগরণের পরিচায়ক।

হজ থেকে ফিরে এসে সৈয়দ আহমদ দুই দিক দিয়ে তাঁর আন্দোলন চালিয়ে যান:
সমাজ থেকে কুসংস্কার, শিরক, বিদআত ও জুলুম নির্যাতন দূর করে মুসলমানদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবন উন্নত করা;

এবং ইংরেজদের বিতাড়িত করে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাঁর আন্দোলনে সুফি তরিকার আধ্যাত্মিক প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

১৮২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে হিজরত করেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পেশোয়ারে। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকা, ফরিদপুর, বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় এক থেকে দুই হাজার মুসলিম স্বেচ্ছাসেবী তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। এই অংশগ্রহণ ছিল ইসলামের প্রতি গভীর প্রেম ও স্বাধীনতার দৃঢ়সংকল্পের প্রতিফলন।

পেশোয়ারে পৌঁছে স্থানীয় মুসলমানরা তাঁকে "আমীরুল মুমিনিন" (মুমিনদের নেতা) হিসেবে গ্রহণ করে। তিনি সেখানে একটি ইসলামী শাসন কাঠামো গঠনের চেষ্টা করেন এবং স্থানীয় পাঠান গোত্রগুলোর সহায়তায় শিখ বাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নেন।

প্রথমেই আকোড়া নামক স্থানে এক অতর্কিত রাতের যুদ্ধে তাঁর মুজাহিদ বাহিনী প্রায় ৭০০ শিখ সৈন্যকে পরাজিত করে, যদিও এতে প্রায় ৮০ জন মুসলিম মুজাহিদ শহীদ হন। এই বিজয় মুজাহিদদের মনোবলে নতুন উদ্দীপনা আনে এবং জিহাদের ময়দানে তাদের অটুট বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।

মহারাজা রঞ্জিত সিং গোপনে পাঠান গোত্রপতিদের ঘুষ দিয়ে সৈয়দ আহমদের বিপক্ষে দাঁড় করান। ১৮৩০ সালের শেষ দিকে স্থানীয় বিশ্বাসঘাতকদের কারণে তাঁর বহু সেনা হতাহত হয় এবং তিনি বাধ্য হন পেশোয়ার ত্যাগ করে পাহাড়ি অঞ্চল বালাকোটে আশ্রয় নিতে। তবুও তিনি হার মানেননি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গেরিলা কৌশলে শিখদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে, তিনি মানসেহরা জেলার দুর্গম পার্বত্য এলাকা বালাকোটকে জিহাদের শেষ ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেন, যা পরিণত হয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে।

•বালাকোটের চূড়ান্ত যুদ্ধ: আত্মত্যাগের অমরগাথা:


একদিকে সীমান্ত এলাকার সর্দারদের অর্থলোভ ও বিশ্বাসঘাতকতা, অন্যদিকে শিখদের বিশাল সুসজ্জিত বাহিনী-এই অসম পরিস্থিতিতেও বীর মুজাহিদ সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) হাল ছাড়েননি। পাহাড়ঘেরা দুর্গম উপত্যকায় থেকেও তিনি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবার দৃঢ়সংকল্পে অটল ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম মুজাহিদরা অত্যাচারী শিখ ও ইংরেজ শাসকদের বিতাড়ন করে ভারতবর্ষে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য।

বালাকোট-চারদিক পাহাড়ে ঘেরা এক সবুজ উপত্যকা, সৈয়দ আহমদের ইসলামী আন্দোলনের শেষ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৮৩১ সালের ৬ মে, শুক্রবার ভোরবেলা, এই উপত্যকায় শেষ লড়াই শুরু হয়। সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ও তাঁর প্রধান সহযোদ্ধা শাহ ইসমাঈল দেহলভী প্রায় ৬০০-৭০০ মুজাহিদ নিয়ে বালাকোটে অবস্থান নেন। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল শিখ সাম্রাজ্যের প্রায় ১০,০০০ সৈন্য, যাদের নেতৃত্বে ছিল কনওয়ার শের সিং, মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের সেনাপতি।

ভোর হওয়ার আগেই মুজাহিদরা মসজিদে বালার কাছে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং হঠাৎ করে শিখ বাহিনীর ওপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আক্রমণে তারা সাফল্যও পায়-শিখদের একটি দলকে আশ্চর্যজনকভাবে ঘায়েল করা সম্ভব হয়। কিন্তু শিখদের সংখ্যাগত ও অস্ত্রশক্তির আধিক্যের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। শের সিং পুরো উপত্যকাকে ঘিরে ফেলে এবং মেটিকোট পাহাড়ের ওপর থেকে অসংখ্য শিখ সৈন্য নিচে নেমে চারদিক থেকে মুজাহিদদের আক্রমণ করে।

সৈয়দ আহমদ ও শাহ ইসমাঈল সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং আত্মত্যাগের এক অমর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে সৈয়দ আহমদ শহীদ হন মেটিকোট পাহাড়ের একটি ঝরনার পাশে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহ ইসমাঈল দেহলভীও শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। তাঁদের শাহাদাতের খবর মুজাহিদদের কাছে সঙ্গে সঙ্গে না পৌঁছানোয় অনেকে ইমামকে খুঁজতে খুঁজতে বিভ্রান্ত হয়ে শত্রুর হাতে নিহত হন। এদিকে কিছু সাহসী মুজাহিদ যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও সংখ্যার ভারে দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।

যুদ্ধ চলাকালে স্থানীয় গুজর গোত্রের কিছু ব্যক্তি প্রচার করে, "সৈয়দ সাহেব নিরাপদে পাহাড়ের ওপরে আছেন, সবাই দ্রুত সেদিকে চলে যান।" এই ঘোষণায় বিভ্রান্ত হয়ে অনেক মুজাহিদ পিছনে সরে যান এবং সেই সুযোগে শিখ বাহিনী পুরোপুরি জয়লাভ করে। এই দিনের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ৩০০ মুজাহিদ শহীদ হন, যাদের মধ্যে বাংলাদেশের (তৎকালীন বাংলা অঞ্চলের) মুজাহিদরাও ছিলেন। শিখ সৈন্যরা সৈয়দ আহমদের মৃতদেহ খুঁজে পেয়ে শিরশ্ছেদ করে এবং বহু অনুসারীকেও নির্মমভাবে হত্যা করে। যুদ্ধ শেষে বালাকোটের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে তারা মুসলমানদের বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করে।

তবুও এই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। মাত্র ৭০০ মুজাহিদের বাহিনী প্রায় ১,০০০ শিখ সৈন্যকে হতভম্ব করে অসীম সাহসিকতার যে উদাহরণ স্থাপন করেছিল, তা উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অদ্বিতীয় অধ্যায়। এত বড় আত্মত্যাগের ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। ১৮৩১ সালের ১৮ মে, অর্থাৎ ১১ দিন পর বাংলায় বঙ্গবীর তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ব্রিটিশ কামানের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনিও শাহাদাত বরণ করেন। সৈয়দ আহমদ শহীদের "তরীকা-এ-মুহাম্মদী" আন্দোলন তাঁর শাহাদাতের পরও থেমে যায়নি-বরং তা হয়ে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী দীর্ঘস্থায়ী ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এই আন্দোলনই পরবর্তী মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ রোপণ করে।

•আন্দোলনের আদর্শিক ও আধ্যাত্মিক দিক:


সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর নেতৃত্বে বালাকোটের আন্দোলন "তরীক-এ-মুহাম্মদী" নামে পরিচালনা করেন, যার মূলমন্ত্র ছিল-হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শে সমাজ সংস্কার ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা। শাহ ইসমাঈল দেহলভী-সহ বিশিষ্ট আলেমরা তাঁর সহযোগী ছিলেন। তিনি খিলাফতের আদলে একটি শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সীমান্ত অঞ্চলে তিনি অল্প সময়ের জন্য হলেও শরিয়তের আলোকে শাসন চালু করেন। তিনি:
পণপ্রথা ও জোরপূর্বক বিয়ে নিষিদ্ধ করেন,
জাকাত ও উশর আদায় করে বায়তুলমাল গঠন করেন,
এবং গোত্রীয় রীতি না মেনে শরিয়তের বিধান মানার নির্দেশ দেন।

এই সংস্কারমূলক কার্যক্রমে কিছু গোত্র ও নেতা অসন্তুষ্ট হলেও এটি ছিল ন্যায়ভিত্তিক ইসল, সাহসী প্রয়াস। সৈয়দ আহমদের এই আন্দোলনের আদর্শিক ধারা আরবের মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহ।, ভারতের হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীর-এর আন্দোলনের সঙ্গেও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

যুদ্ধোত্তর পরিণতি ও আন্দোলনের উত্তরাধিকার:


বালাকোটের ময়দানে সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ও তাঁর প্রধান সহযোদ্ধাদের শাহাদাত আন্দোলনটির তাৎক্ষণিক সামরিক পরাজয় নিশ্চিত করেছিল। তবে এই পরাজয়ের মধ্যেও তাঁদের আত্মত্যাগ ও আদর্শিক দৃঢ়তা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। যুদ্ধের পর শিখ বাহিনী সীমান্ত অঞ্চলে দমন-পীড়নের মাধ্যমে পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সৈয়দ আহমদের পরিবারের কিছু সদস্য ভারতে টঙ্কে আশ্রয় নেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরও আন্দোলন একেবারে থেমে যায়নি।

ইমাম মাহমুদ, যিনি সৈয়দ আহমদের খলিফা ছিলেন, কিছুদিন আন্দোলনের হাল ধরার চেষ্টা করেন। এরপর উইলায়ত আলী ও এনায়েত আলীর নেতৃত্বে ১৮৫০'র দশক পর্যন্ত ছোট পরিসরে আন্দোলনের কার্যক্রম চলমান ছিল। তবুও ব্রিটিশরা সংগঠিতভাবে এই অবশিষ্ট অনুসারীদেরও দমন করে। সংখ্যায় ও অস্ত্র-সরঞ্জামে দুর্বলতা একটি কারণ হলেও অধিকাংশ গবেষক স্থানীয় বিশ্বাসঘাতকতাকেই মূল কারণ হিসেবে দেখেন।

শুরুর দিকে যেসব স্থানীয় মুসলিম নেতা সৈয়দ আহমদকে আহ্বান জানিয়ে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন, যুদ্ধের সময় তারা অনেকেই পাশে ছিলেন না। বরং কেউ কেউ শিখদের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়েছিলেন। এমনকি মুজাহিদ বাহিনীতে গুপ্তচর হিসেবে প্রবেশ করে শিখদের গোপন পাহাড়ি পথ দেখিয়ে দেয়, যা তাদের আক্রমণ সফল করে তোলে। হাজারা এলাকার এক গোত্রপ্রধান শিখদের বালাকোট ঘিরে ধরার গোপন রাস্তা দেখিয়ে দেয়। আবার পেশোয়ারে সৈয়দ আহমদ যাকে শাসক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই সুলতান মুহাম্মদ খান বিশ্বাসঘাতকতা করে অনেক শীর্ষ মুজাহিদকে হত্যা করেন এবং শত্রুপক্ষকে সুবিধা পাইয়ে দেন।

সৈয়দ আহমদ শহীদ উপমহাদেশের মুসলমানদের মনে "শাহাদাত" ও "ইসলামী রাষ্ট্র" চেতনার যে বীজ বপন করেছিলেন, তা পরবর্তীতে বহু আন্দোলনে অঙ্কুরিত হয়। পশ্চিমা গবেষক এডওয়ার্ড মোর্টিমার বলেছেন, “সৈয়দ আহমদ ছিলেন আধুনিক ইসলামপন্থিদের একজন প্রথমদিকের চিন্তাবিদ, যিনি ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রামকে একত্রিত করে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।" তাঁর নেতৃত্বে গঠিত মুজাহিদ বাহিনী মুসলমানদের মধ্যে যে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ ও আত্মশুদ্ধির চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছিল, এই আদর্শ পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে-
দেওবন্দি উলামাদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে,
তিতুমীরের কৃষক বিদ্রোহে,
আধুনিক কালের বাংলাদেশ, পাকিস্তান-আফগানিস্তান অঞ্চলের ইসলামী সংগঠনগুলোর মাঝেও।
সর্বসম্মতিক্রমে বলা যায়- সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের প্রথমদিককার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একজন, যাঁর আদর্শ, সংগ্রাম, জীবন ও মৃত্যু একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় ইসলামী জাগরণের উজ্জ্বল প্রতীক।

•বালাকোটের শিক্ষা ও আমাদের প্রেরণা:


বালাকোটের যুদ্ধ এবং সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) যেমন মুসলমানরা ইসলামী আদর্শ ও স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছেন, আজও ঠিক তেমনি বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলমানরা একই সংগ্রামে লিপ্ত। আজ কাশ্মীরে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের, ফিলিস্তিনে জায়নবাদী ইহুদিদের, চীনের জিনজিয়াংয়ে বৌদ্ধ-চিনপন্থি শাসকদের, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধ চরমপন্থিদের নির্যাতন-এসবই দেখায় যে মুসলিম জাতি এখনো চরম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামও এই একই ঐতিহাসিক ধারার অংশ, যা বালাকোটের চেতনা থেকেই অনুপ্রাণিত।

প্রথমত, ঐক্যের শিক্ষা
সৈয়দ আহমদের আন্দোলন স্থানীয় মুসলমানদের বিভেদ ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরাজিত হয়। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যখন মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন তারা বিজয়ী হয়েছে। আজকের তরুণদের এই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে-মতপার্থক্য ভুলে ন্যায়ের লক্ষ্যে একতাবদ্ধ হওয়াই হচ্ছে সাফল্যের চাবিকাঠি।

দ্বিতীয়ত, আদর্শের প্রতি অবিচলতা ও আত্মত্যাগ
সৈয়দ আহমদ শহীদ ও তাঁর সাথীরা ঈমান, ন্যায় ও স্বাধীনতার আদর্শে অটল ছিলেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে,
সত্য ও ইসলামী চেতনার পক্ষে দৃঢ় থাকা এবং প্রয়োজনে প্রাণ দেওয়াড়এই গুণটি মুসলমানদের শক্তির মূলভিত্তি। তারা শত্রুর কাছে মাথা নত করেননি-আমাদেরও সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে।

তৃতীয়ত, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির গুরুত্ব
ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা-এই তিনটি গুণই দুর্বলকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। আজকের তরুণদের জীবনের যেকোনো সংগ্রামে-হোক তা সামাজিক ন্যায়, নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন বা জাতির উন্নয়ন-নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক সততাই তাদের সফলতার প্রধান হাতিয়ার।

চতুর্থত, সংগঠিত নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা
সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) সীমিত সম্পদ নিয়েও একটি সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন-যার নিজস্ব অর্থসংগ্রহ, কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বব্যবস্থা ছিল। আজকের বাংলাদেশে কিংবা মুসলিম সমাজে যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা নয়, দরকার সৎ নেতৃত্ব ও সংগঠিত কর্মপন্থা।

পঞ্চমত, চেতনার উত্তরাধিকার
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে সেই ইতিহাস ও বালাকোটের ইতিহাসের শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনাকে এক জায়গায় মিলিত করে। স্বাধীনতা মুখের কথা নয়-এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়। তাই আমরা যেন কখনো আমাদের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ভুলে না যাই।

•উপসংহার:

বদর থেকে বালাকোট-এই দীর্ঘ সময়সীমায় মুসলিম উম্মাহ বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা ঈমান, আত্মত্যাগ ও ন্যায়ের প্রতি অটল থেকে ইতিহাস সৃষ্টি করতে জানে। সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর নেতৃত্বে সংঘটিত বালাকোট আন্দোলন সেই ধারাবাহিক সংগ্রামের ধর্মীয় আদর্শ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা একসূত্রে মিলিত হয়ে গড়েছিল এক অনন্য ইতিহাস।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বসূরি ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি, যেখান থেকে আমরা ঐক্য, আত্মত্যাগ ও আদর্শের প্রতি অবিচলতা সম্পর্কে শিক্ষা পাই। সত্য ও স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্মৃতি আমাদের সাহস জোগায়। তাদের আত্মত্যাগের মূল্যেই আজ আমরা স্বাধীন সেই শিক্ষা আমাদের জাতি গঠনের দায়িত্বে আরও সচেতন করে। বালাকোটের শহীদগণ আমাদের প্রেরণা জোগান। আসুন, আমরা নিজ নিজ আদর্শে অটল থেকে জাতির কল্যাণ ও ইসলামী মূল্যবোধ সংরক্ষণে আত্মনিয়োগ করি। আমরা যদি অতীতের সেই মহান শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে ইনশাআল্লাহ আগামীর সুন্দর ও ন্যায়ের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।


তথ্যসূত্র:
১. বদর থেকে বালাকোট, বদরুজ্জামান, দি পাথফাইন্ডার পাবলিকেশন্স, ১ম প্রকাশ, ২০২১
২. চেতনার বালাকোট, শেখ জেবুল আমিন দুলাল, প্রফেসর'স পাবলিকেশন্স, ৬ষ্ঠ প্রকাশ, ২০১২
৩. কারবালা থেকে বালাকোট, মুহাম্মদ সোলায়মান ফররুখ আবাদী, প্রতীতি প্রকাশন
৪. শহীদে বালাকোট (শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ. (১২৪৬-১৮৩১), আল্লামা খালেদ মাহমূদ, মাওলানা আবদুল গাফফার শাহপুরী
(অনুবাদক), নূরুল কুরআন প্রকাশনী, ১ম প্রকাশ, ২০১৮
৫. বালাকোটের প্রান্তর, আরীফুর রহমান, আবরণ প্রকাশন, ১ম প্রকাশ, ২০২১

[ বুকলেট প্রকাশনায়: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ]

Tuesday, March 11, 2025

১১ মার্চ: ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক শহীদ দিবস || শাহাদাতের পথ মাড়িয়ে নিরন্তর ছুটে চলা

১১ মার্চ: ঐতিহাসিক শহীদ দিবস— শাহাদাতের পথ মাড়িয়ে নিরন্তর ছুটে চলা।

১৯৮২ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামবিরোধী শক্তির আঘাতে প্রাণ হারান আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ শাব্বির, হামিদ, আইয়ুব ও জব্বার।

• ঘটনার সূত্রপাত:
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর জন্য ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীল ও কর্মীরা ১০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নবীনবরণের প্রচার কার্য চালানোর সময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলা চালায়, এতে কয়েকজন শিবিরকর্মী আহত হন। শিবির তাদের শত উসকানি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে।

• ১১ মার্চের রক্তাক্ত সকাল:
১১ মার্চ সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরের আহ্বানে নবাগত ছাত্রসংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। চারদিক থেকে শত শত ছাত্রশিবিরকর্মী গগনবিদারী শ্লোগান দিতে দিতে অনুষ্ঠানস্থলে আসতে থাকেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও পাশের শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। তাদের হাতে ছিল হকিস্টিক, রামদা, বর্শা, ফালা, ছোরা, চাইনিজ কুড়ালসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র।

শিবিরের সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বারবার অনুষ্ঠান পণ্ড করার জন্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। শিবির নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য ছিল শিবিরকে স্তব্ধ করে দেওয়া। তথাকথিত বামপন্থার কেন্দ্রবিন্দু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের এ ধরনের বড় আয়োজন তারা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেনি। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরাও শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে।

একপর্যায়ে নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চতুর্দিক থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিবিরকর্মীরা সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় শহর থেকে ট্রাকভর্তি বহিরাগত অস্ত্রধারীরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগ দেয়।

সন্ত্রাসীদের আক্রমণের প্রচণ্ডতায় নিরস্ত্র ছাত্রশিবির কর্মীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। আত্মরক্ষার জন্য শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও কেন্দ্রীয় মসজিদে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তারা সন্ত্রাসীদের নৃশংস আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি।

সন্ত্রাসীরা পাশবিক কায়দায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। শহীদ শাব্বির আহম্মেদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তার বুকের ওপর পা রেখে মাথায় লোহার রড ঢুকিয়ে দেয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শহীদ আব্দুল হামিদকে চরম নির্যাতনের সময় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা একটি ইট মাথার নিচে দিয়ে আরেকটি ইট দিয়ে তার মাথায় একের পর এক আঘাত করে। এতে তার মাথার মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তার রক্তাক্ত মুখমণ্ডল দেখে চেনার কোনো উপায় ছিল না। ১২ মার্চ রাত ৯টায় তিনি শাহাদাতের অমীয় পেয়ালা পান।

শহীদ আইয়ুব ভাই ১২ মার্চ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে শাহাদাত বরণ করেন। দীর্ঘ কষ্ট ভোগের পর ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শহীদ আব্দুল জব্বার ভাই।

সন্ত্রাসীরা দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর বিভীষিকা সৃষ্টি করলেও মাত্র কিছু দূরত্বে অবস্থানরত পুলিশবাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেও এগিয়ে আসেনি। বারবার অনুরোধের পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর মোসলেম হুদার প্রশাসন দীর্ঘ সময় ধরে এ হত্যাকাণ্ডে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনাসহ শিবিরবিরোধী প্রতিটি ঘটনায় বাম ও রামপন্থী শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক।

১১ মার্চের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তারা শিবিরকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে মরণকামড় দিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তাদের ষড়যন্ত্র বুমেরাং হয়েছে। তারাই তাদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকে পড়ে। তারা আমাদের উৎখাত করতে পারেনি, বরং শহীদের রক্ত মতিহারের সবুজ চত্বরকে করেছে উর্বর, শহীদদের সাথীদের করেছে উজ্জীবিত।

মতিহারের সবুজ চত্বর হয়েছে শিবিরের একক মজবুত ঘাঁটি। হত্যা, জুলুম ও নির্যাতন ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করেছে—এ সত্য আবারও প্রমাণিত হয়েছে।

আরো বিস্তারিত জানতে পড়ুন: