
সালতানাতে বাঙ্গালা: এক অখণ্ড জাতিসত্তার উত্থান ও সমৃদ্ধ বাঙলার সূচনা
পাল বংশের পতনের পর সেন রাজারা যখন দক্ষিণ ভারত থেকে এসে বাঙলার ক্ষমতা দখল করেন, তখন তারা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিপরীতে এক উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থা চাপিয়ে দেন। জাতি-ভেদ প্রথা এবং সাধারণ মানুষের ভাষার প্রতি অবজ্ঞা সাধারণ জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ঠিক সেই সময়ে ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া বিজয়ের মাধ্যমে বাঙলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। এটি ছিল শৃঙ্খলিত বাঙালির জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা।
সেনদের শাসনামল পালদের চেয়ে কম সময়ের জন্য হলেও বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপুর্ণ ছিল। বাঙলা ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ভুক্ত লোকদের আবাসস্থল। সবাই শান্তিতে সহাবস্থান করতো। শাসকদের সাথে স্থানীয়দের সুসম্পর্ক ছিল এবং শাসকেরা স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও অর্থনীতির উন্নতি সাধনের চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেনদের আগমন এই অঞ্চলের লোকদের একটি নতুন ও তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। সেনরা ব্রাহ্ম্যণ্যবাদী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। (তখন হিন্দু বলতে কোন ধর্মের অস্তিত্ব ছিলো না। হিন্দু ধর্ম নামটি বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চালু হয়)। তারা জাত-পাতের নামে স্বীয় ধর্মের মধ্যেই চার স্তরের বিভাজন চালু করেন। ব্রাহ্মণরা সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা পেতো এবং বাকীদের অবস্থা ছিল শোচনীয়।
সংস্কৃত ভাষা - যা রাজভাষার মর্যাদা পেয়েছিল - সবার চর্চা করার স্বাধীনতা ছিল না। ফলে স্থানীয় ভাষার কোনো ধরণের উন্নতি সে সময়ে হয়নি। চর্যাপদের পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্য রচনা না হওয়ার এ ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক কারণ। সেনদের এই রাষ্ট্রীয় অসহযোগীতা, ভিন্ন ধর্মীদের উপর নির্যাতন নিষ্পেষণ ইত্যাদি কারণে এই সময়ে কোনো সাহিত্য কর্ম পাওয়া যায় না যার মাধ্যমে তৎকালীন সময়ের শাসক ও শাসিতদের মধ্যকার সুসম্পর্ক সম্পর্কে জানা যেতে পারে। এজন্যে এই সময়কে বাঙলা ভাষার জন্য অন্ধকার যুগ হিসেবে অভিহিত করা যায়।
সেনদের এই রূপ নির্যাতন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে তৎকালীন বাঙলার জনসমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সুন্দরবনের রাজা সহ বিভিন্ন স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং সেনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই সময় দিল্লীতে মুসলিম শাসনের সুত্রপাত ঘটেছিল এবং ধীরে ধীরে এর সীমানা বাঙলার নিকট পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। সে সময় বিভিন্ন সূফী - যারা মূলত যোদ্ধাও ছিলেন, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিভিন্ন খানকা কিংবা দল বল সহ অবস্থান করতে শুরু করেন। তারা ইসলাম প্রচার করতেন পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা জয়েও সাহায্য করতেন।
দিল্লী সালতানাতের সুলতানেরা সবসময় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এইসব যোদ্ধা সুফীদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সীমানা প্রসারে ভূমিকা রাখেন। শাহ জালালা, খান জাহান আলী, বাবা আদম শহীদ, শাহ মাখদুম প্রমুখ সূফিদের বাঙলায় আগমণ, অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্থানীয়দের উদ্ধার, ইসলাম প্রচার এবং বিভিন্ন এলাকায় খানকাহ ও বসতি স্থাপনের মাধ্যমে নতুন সমাজ ব্যবস্থার সূচনা এসব এইভাবেই সম্ভব হয়েছিল।
সেনদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাঙলার অধিবাসীরা একজন ত্রাণকর্তার জন্যে অপেক্ষার প্রহর গুণছিলেন। স্থানীয় বিদ্রোহীরা সাহায্যের জন্য বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করা একজন মুসলিম সেনাপতির সাথে যোগাযোগ করে তাকে বাঙলা আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী ছিলেন সেই সেনাপতি। তিনি দক্ষ সমরবিদ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। তিনি সেনদের সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য ছক কষতে শুরু করলেন। বাঙলায় প্রবেশের সবচেয়ে সংকীর্ণ ও কঠিন পথটি তিনি বাছাই করলেন এবং ঝাড়খন্ড দিয়ে নদীয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঝাডখন্ড ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা, যে পথ দিয়ে একক কোনো সেনা দলের যাওয়া অসম্ভব। এই অসুবিধার কথা চিন্তা করে তিনি মাত্র সতেরো জন সওয়ারী নিয়ে ঘোড়ায় করে লক্ষণ সেনের রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করেন। ভর দুপুরে আকস্মিক আক্রমণে লক্ষণ সেন হতবিহ্বল হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। ফলে প্রায় বিনা বাঁধায় ও বিনা রক্তপাতে বাঙলায় মুসলিম শাসনের সুত্রপাত হয়। এর মাধ্যমে বাঙলায় দির্ঘদিন ধরে চলা কৌলীন্য প্রথা ও বিভাজনের সংস্কৃতির অবসান হয়। সূচনা ঘটে এক নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার, যেখানে সব ধর্ম, গোত্র, বর্ণের লোকেরা সমান মর্যাদায় ভূষিত হয়।
বাঙলার মুসলিম শাসনামলের প্রথম পর্বকে সুলতানি আমল বলে অভিহিত করা হয়। এই সময়ব্যাপী বাঙলা কখনো দিল্লী সালতানাতের একটি প্রদেশ হিসেবে আবার কখনো স্বাধীন দেশ হিসেবে শাসিত হয়েছে। মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে বাঙলা নামে একক কোনো রাজনৈতিক ভূখন্ড ছিল না। বাঙলা সমতট, হরিকেল, বঙ্গ, গৌড়, রাঢ় ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চল ও জনপদে বিভক্ত ছিল। বাঙলার শাসকেরা নিজেদের গৌড়েশ্বর দাবী করতেন। তাছাড়া মুসলিমদের আগে কেউ সমগ্র বাঙলা নিজের অধীনে নিয়ে আসতে পারেনি।
রাজনৈতিক বিবর্তন ও অখণ্ড বাঙলার জন্ম
বখতিয়ার খিলজীর বিজয়ের পর থেকে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত বাঙলা দিল্লির সুলতানদের অধীনে একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হতো। কিন্তু বাঙলার ভৌগোলিক দূরত্ব এবং বিদ্রোহী মনোভাবের কারণে দিল্লি থেকে শাসন পরিচালনা করা কঠিন ছিল।
শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ: অখণ্ড বাঙলার স্থপতি
১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ লখনৌতির সিংহাসন দখল করেন এবং ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও বিজয়ের মাধ্যমে সমগ্র বাঙলাকে একীভূত করেন। তিনি প্রথম শাসক যিনি নিজেকে 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' বা 'বাঙলার রাজা' হিসেবে ঘোষণা করেন। এর আগে বাঙলা গৌড়, বঙ্গ, রাঢ়, হরিকেল—এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদে বিভক্ত ছিল। ইলিয়াস শাহ-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একত্রিত করে 'বাঙ্গালাহ' নামক একক রাজনৈতিক রাষ্ট্র গঠন করেন।
আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ: বাঙলার সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগ
বাঙলার সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উদার শাসক ছিলেন আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)। তাঁর শাসনকাল ছিল শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর শাসনামলে হিন্দুরা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। যেমন তাঁর উজির ছিলেন গোপীনাথ বসু এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস। হিন্দু প্রজারা তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাঁকে 'নৃপতি তিলক' ও 'জগতভূষণ' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা
সুলতানি আমলের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হলো বাঙলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সেন আমলে যে ভাষাকে 'অস্পৃশ্য' মনে করা হতো, সুলতানরা সেই ভাষাকে রাজদরবারে মর্যাদা দেন। সুলতানদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত থেকে রামায়ণ ও মহাভারত বাঙলায় অনূদিত হয়। কৃত্তিবাস ওঝা এবং মালাধর বসুর মতো কবিরা সুলতানদের রাজকীয় অনুদান পেতেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন সাহিত্যের সমঝদার সুলতান। পারস্যের মহাকবি হাফিজের সাথে তাঁর পত্রালাপ ছিল। তাঁর সময়েই শাহ মুহম্মদ সগীর প্রথম বাঙলা রোমান্টিক কাব্য 'ইউসুফ-জুলেখা' রচনা করেন। এই যুগেই নাথ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর ব্যাপক বিকাশ ঘটে, যা বাঙলা সাহিত্যের ভিত্তি মজবুত করে।
সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন: সুফিবাদ ও সাম্য
সুলতানি আমলে বাঙলায় ইসলামের প্রচার হয়েছিল মূলত তরবারির জোরে নয়, বরং সুফি-দরবেশদের চারিত্রিক মাধুর্য এবং সাম্যের বাণীর মাধ্যমে। শাহ জালাল (র.), খান জাহান আলী (র.) এবং শাহ মাখদুমের মতো সাধকরা অবহেলিত নিম্নবর্ণের মানুষদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। ইসলামের 'একত্ববাদ' এবং 'সাম্য' বর্ণপ্রথার যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়। সুলতানী আমলে মন্দির ও মসজিদ উভয় নির্মাণের জন্যই ভূমি বরাদ্দ হতো। এই সময়েই হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিলনে এক নতুন 'বাঙালি সংস্কৃতি'র জন্ম হয়।
বিচার ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার
সুলতানি আমলে বিচার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর ও নিরপেক্ষ। বিচার বিভাগ (কাজী আদালত) শাসন বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সেই বিখ্যাত ঘটনা সুলতানী আমলের বিচার ব্যবস্থার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি শিকার করতে গিয়ে ভুলবশত এক বিধবার ছেলেকে হত্যা করেন। কাজী সুলতানকে অপরাধী সাব্যস্ত করে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সুলতান আইন মেনে হাজির হন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বাঙলায় আইনের চোখে সবাই সমান ছিল।
স্থাপত্য ও শিল্পকলা
স্থাপত্যের ক্ষেত্রে সুলতানি আমলে নিজস্ব একটি শৈল্পিক ধাঁচ তৈরি হয়েছিল। পাথরের অভাব থাকায় পোড়ামাটির ইট বা টেরাকোটার কাজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ (তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ), গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, এবং বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ সুলতানি স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মসজিদের দেওয়ালে লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার এক অনন্য নান্দনিকতা দান করে, যা মুঘল স্থাপত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: জান্নাতুল বিলাদ
সুলতানি আমলে বাঙলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কারণে বাঙলার অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। চট্টগ্রাম ও সোনারগাঁও বন্দর দিয়ে চীন, পারস্য এবং ইউরোপের সাথে বাণিজ্য চলত। মসলিন এবং রেশম বস্ত্রের জন্য বাঙলা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিল। বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ সালে বাঙলা সফর করে লিখেছিলেন যে, দুনিয়ার আর কোথাও তিনি এতো সস্তায় খাদ্যদ্রব্য দেখেননি। তিনি বাঙলাকে 'নিয়ামতে পূর্ণ দোজখ' বলেছিলেন (অত্যধিক গরমের কারণে দোজখ, কিন্তু প্রাচুর্যের কারণে নিয়ামত)। সুলতানরা নিজস্ব রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন, যা শক্তিশালী অর্থনীতির সূচক।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা
সুলতানরা শিক্ষার বিস্তারে ব্যাপকভাবে মাদ্রাসা ও মক্তব নির্মাণ করেছিলেন। সোনারগাঁও ছিল তৎকালীন এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেন্দ্র। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাহ সোনারগাঁওয়ে একটি বিশাল মাদ্রাসা ও লাইব্রেরি স্থাপন করেন, যেখানে ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, রসায়ন ও গণিত পড়ানো হতো। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন।
সুলতানি আমল ছিল বাঙলার অন্ধকার যুগ থেকে আলোর পথে যাত্রার সেতুবন্ধন। এই সময়েই বাঙলা ভাষা তার স্থায়ী রূপ লাভ করে এবং বাঙালি হিসেবে একটি সম্মিলিত জাতিসত্তা গঠিত হয়। সেন আমলের বিভাজনমূলক সমাজব্যবস্থা ভেঙে সাম্য ও ইনসাফের যে সমাজ সুলতানরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারই রেশ ধরে আজকের আধুনিক বাঙলাদেশ। ইতিহাসবিদদের মতে, সুলতানি আমল না থাকলে বাঙলা ভাষা হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেত।





