Close

Saturday, April 11, 2026

সালতানাতে বাঙ্গালা: এক অখণ্ড জাতিসত্তার উত্থান ও সমৃদ্ধ বাঙলার সূচনা

সালতানাতে বাঙ্গালা: এক অখণ্ড জাতিসত্তার উত্থান ও সমৃদ্ধ বাঙলার সূচনা

সালতানাতে বাঙ্গালা: এক অখণ্ড জাতিসত্তার উত্থান ও সমৃদ্ধ বাঙলার সূচনা

পাল বংশের পতনের পর সেন রাজারা যখন দক্ষিণ ভারত থেকে এসে বাঙলার ক্ষমতা দখল করেন, তখন তারা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিপরীতে এক উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থা চাপিয়ে দেন। জাতি-ভেদ প্রথা এবং সাধারণ মানুষের ভাষার প্রতি অবজ্ঞা সাধারণ জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ঠিক সেই সময়ে ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া বিজয়ের মাধ্যমে বাঙলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। এটি ছিল শৃঙ্খলিত বাঙালির জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা।

সেনদের শাসনামল পালদের চেয়ে কম সময়ের জন্য হলেও বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপুর্ণ ছিল। বাঙলা ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ভুক্ত লোকদের আবাসস্থল। সবাই শান্তিতে সহাবস্থান করতো। শাসকদের সাথে স্থানীয়দের সুসম্পর্ক ছিল এবং শাসকেরা স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও অর্থনীতির উন্নতি সাধনের চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেনদের আগমন এই অঞ্চলের লোকদের একটি নতুন ও তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। সেনরা ব্রাহ্ম্যণ্যবাদী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। (তখন হিন্দু বলতে কোন ধর্মের অস্তিত্ব ছিলো না। হিন্দু ধর্ম নামটি বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চালু হয়)। তারা জাত-পাতের নামে স্বীয় ধর্মের মধ্যেই চার স্তরের বিভাজন চালু করেন। ব্রাহ্মণরা সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা পেতো এবং বাকীদের অবস্থা ছিল শোচনীয়।

সংস্কৃত ভাষা - যা রাজভাষার মর্যাদা পেয়েছিল - সবার চর্চা করার স্বাধীনতা ছিল না। ফলে স্থানীয় ভাষার কোনো ধরণের উন্নতি সে সময়ে হয়নি। চর্যাপদের পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্য রচনা না হওয়ার এ ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক কারণ। সেনদের এই রাষ্ট্রীয় অসহযোগীতা, ভিন্ন ধর্মীদের উপর নির্যাতন নিষ্পেষণ ইত্যাদি কারণে এই সময়ে কোনো সাহিত্য কর্ম পাওয়া যায় না যার মাধ্যমে তৎকালীন সময়ের শাসক ও শাসিতদের মধ্যকার সুসম্পর্ক সম্পর্কে জানা যেতে পারে। এজন্যে এই সময়কে বাঙলা ভাষার জন্য অন্ধকার যুগ হিসেবে অভিহিত করা যায়।

সেনদের এই রূপ নির্যাতন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে তৎকালীন বাঙলার জনসমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সুন্দরবনের রাজা সহ বিভিন্ন স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং সেনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই সময় দিল্লীতে মুসলিম শাসনের সুত্রপাত ঘটেছিল এবং ধীরে ধীরে এর সীমানা বাঙলার নিকট পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। সে সময় বিভিন্ন সূফী - যারা মূলত যোদ্ধাও ছিলেন, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিভিন্ন খানকা কিংবা দল বল সহ অবস্থান করতে শুরু করেন। তারা ইসলাম প্রচার করতেন পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা জয়েও সাহায্য করতেন।

দিল্লী সালতানাতের সুলতানেরা সবসময় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এইসব যোদ্ধা সুফীদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সীমানা প্রসারে ভূমিকা রাখেন। শাহ জালালা, খান জাহান আলী, বাবা আদম শহীদ, শাহ মাখদুম প্রমুখ সূফিদের বাঙলায় আগমণ, অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্থানীয়দের উদ্ধার, ইসলাম প্রচার এবং বিভিন্ন এলাকায় খানকাহ ও বসতি স্থাপনের মাধ্যমে নতুন সমাজ ব্যবস্থার সূচনা এসব এইভাবেই সম্ভব হয়েছিল।

সেনদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাঙলার অধিবাসীরা একজন ত্রাণকর্তার জন্যে অপেক্ষার প্রহর গুণছিলেন। স্থানীয় বিদ্রোহীরা সাহায্যের জন্য বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করা একজন মুসলিম সেনাপতির সাথে যোগাযোগ করে তাকে বাঙলা আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী ছিলেন সেই সেনাপতি। তিনি দক্ষ সমরবিদ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। তিনি সেনদের সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য ছক কষতে শুরু করলেন। বাঙলায় প্রবেশের সবচেয়ে সংকীর্ণ ও কঠিন পথটি তিনি বাছাই করলেন এবং ঝাড়খন্ড দিয়ে নদীয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঝাডখন্ড ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা, যে পথ দিয়ে একক কোনো সেনা দলের যাওয়া অসম্ভব। এই অসুবিধার কথা চিন্তা করে তিনি মাত্র সতেরো জন সওয়ারী নিয়ে ঘোড়ায় করে লক্ষণ সেনের রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করেন। ভর দুপুরে আকস্মিক আক্রমণে লক্ষণ সেন হতবিহ্বল হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। ফলে প্রায় বিনা বাঁধায় ও বিনা রক্তপাতে বাঙলায় মুসলিম শাসনের সুত্রপাত হয়। এর মাধ্যমে বাঙলায় দির্ঘদিন ধরে চলা কৌলীন্য প্রথা ও বিভাজনের সংস্কৃতির অবসান হয়। সূচনা ঘটে এক নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার, যেখানে সব ধর্ম, গোত্র, বর্ণের লোকেরা সমান মর্যাদায় ভূষিত হয়।

বাঙলার মুসলিম শাসনামলের প্রথম পর্বকে সুলতানি আমল বলে অভিহিত করা হয়। এই সময়ব্যাপী বাঙলা কখনো দিল্লী সালতানাতের একটি প্রদেশ হিসেবে আবার কখনো স্বাধীন দেশ হিসেবে শাসিত হয়েছে। মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে বাঙলা নামে একক কোনো রাজনৈতিক ভূখন্ড ছিল না। বাঙলা সমতট, হরিকেল, বঙ্গ, গৌড়, রাঢ় ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চল ও জনপদে বিভক্ত ছিল। বাঙলার শাসকেরা নিজেদের গৌড়েশ্বর দাবী করতেন। তাছাড়া মুসলিমদের আগে কেউ সমগ্র বাঙলা নিজের অধীনে নিয়ে আসতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিবর্তন ও অখণ্ড বাঙলার জন্ম

বখতিয়ার খিলজীর বিজয়ের পর থেকে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত বাঙলা দিল্লির সুলতানদের অধীনে একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হতো। কিন্তু বাঙলার ভৌগোলিক দূরত্ব এবং বিদ্রোহী মনোভাবের কারণে দিল্লি থেকে শাসন পরিচালনা করা কঠিন ছিল।


শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ: অখণ্ড বাঙলার স্থপতি

১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ লখনৌতির সিংহাসন দখল করেন এবং ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও বিজয়ের মাধ্যমে সমগ্র বাঙলাকে একীভূত করেন। তিনি প্রথম শাসক যিনি নিজেকে 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' বা 'বাঙলার রাজা' হিসেবে ঘোষণা করেন। এর আগে বাঙলা গৌড়, বঙ্গ, রাঢ়, হরিকেল—এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদে বিভক্ত ছিল। ইলিয়াস শাহ-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একত্রিত করে 'বাঙ্গালাহ' নামক একক রাজনৈতিক রাষ্ট্র গঠন করেন।

আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ: বাঙলার সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগ
বাঙলার সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উদার শাসক ছিলেন আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)। তাঁর শাসনকাল ছিল শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর শাসনামলে হিন্দুরা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। যেমন তাঁর উজির ছিলেন গোপীনাথ বসু এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস। হিন্দু প্রজারা তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাঁকে 'নৃপতি তিলক' ও 'জগতভূষণ' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা

সুলতানি আমলের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হলো বাঙলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সেন আমলে যে ভাষাকে 'অস্পৃশ্য' মনে করা হতো, সুলতানরা সেই ভাষাকে রাজদরবারে মর্যাদা দেন। সুলতানদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত থেকে রামায়ণ ও মহাভারত বাঙলায় অনূদিত হয়। কৃত্তিবাস ওঝা এবং মালাধর বসুর মতো কবিরা সুলতানদের রাজকীয় অনুদান পেতেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন সাহিত্যের সমঝদার সুলতান। পারস্যের মহাকবি হাফিজের সাথে তাঁর পত্রালাপ ছিল। তাঁর সময়েই শাহ মুহম্মদ সগীর প্রথম বাঙলা রোমান্টিক কাব্য 'ইউসুফ-জুলেখা' রচনা করেন। এই যুগেই নাথ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর ব্যাপক বিকাশ ঘটে, যা বাঙলা সাহিত্যের ভিত্তি মজবুত করে।

সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন: সুফিবাদ ও সাম্য
সুলতানি আমলে বাঙলায় ইসলামের প্রচার হয়েছিল মূলত তরবারির জোরে নয়, বরং সুফি-দরবেশদের চারিত্রিক মাধুর্য এবং সাম্যের বাণীর মাধ্যমে। শাহ জালাল (র.), খান জাহান আলী (র.) এবং শাহ মাখদুমের মতো সাধকরা অবহেলিত নিম্নবর্ণের মানুষদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। ইসলামের 'একত্ববাদ' এবং 'সাম্য' বর্ণপ্রথার যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়। সুলতানী আমলে মন্দির ও মসজিদ উভয় নির্মাণের জন্যই ভূমি বরাদ্দ হতো। এই সময়েই হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিলনে এক নতুন 'বাঙালি সংস্কৃতি'র জন্ম হয়।

বিচার ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার
সুলতানি আমলে বিচার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর ও নিরপেক্ষ। বিচার বিভাগ (কাজী আদালত) শাসন বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সেই বিখ্যাত ঘটনা সুলতানী আমলের বিচার ব্যবস্থার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি শিকার করতে গিয়ে ভুলবশত এক বিধবার ছেলেকে হত্যা করেন। কাজী সুলতানকে অপরাধী সাব্যস্ত করে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সুলতান আইন মেনে হাজির হন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বাঙলায় আইনের চোখে সবাই সমান ছিল।

স্থাপত্য ও শিল্পকলা
স্থাপত্যের ক্ষেত্রে সুলতানি আমলে নিজস্ব একটি শৈল্পিক ধাঁচ তৈরি হয়েছিল। পাথরের অভাব থাকায় পোড়ামাটির ইট বা টেরাকোটার কাজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ (তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ), গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, এবং বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ সুলতানি স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মসজিদের দেওয়ালে লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার এক অনন্য নান্দনিকতা দান করে, যা মুঘল স্থাপত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: জান্নাতুল বিলাদ
সুলতানি আমলে বাঙলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কারণে বাঙলার অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। চট্টগ্রাম ও সোনারগাঁও বন্দর দিয়ে চীন, পারস্য এবং ইউরোপের সাথে বাণিজ্য চলত। মসলিন এবং রেশম বস্ত্রের জন্য বাঙলা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিল। বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ সালে বাঙলা সফর করে লিখেছিলেন যে, দুনিয়ার আর কোথাও তিনি এতো সস্তায় খাদ্যদ্রব্য দেখেননি। তিনি বাঙলাকে 'নিয়ামতে পূর্ণ দোজখ' বলেছিলেন (অত্যধিক গরমের কারণে দোজখ, কিন্তু প্রাচুর্যের কারণে নিয়ামত)। সুলতানরা নিজস্ব রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন, যা শক্তিশালী অর্থনীতির সূচক।

শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা
সুলতানরা শিক্ষার বিস্তারে ব্যাপকভাবে মাদ্রাসা ও মক্তব নির্মাণ করেছিলেন। সোনারগাঁও ছিল তৎকালীন এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেন্দ্র। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাহ সোনারগাঁওয়ে একটি বিশাল মাদ্রাসা ও লাইব্রেরি স্থাপন করেন, যেখানে ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, রসায়ন ও গণিত পড়ানো হতো। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন।

সুলতানি আমল ছিল বাঙলার অন্ধকার যুগ থেকে আলোর পথে যাত্রার সেতুবন্ধন। এই সময়েই বাঙলা ভাষা তার স্থায়ী রূপ লাভ করে এবং বাঙালি হিসেবে একটি সম্মিলিত জাতিসত্তা গঠিত হয়। সেন আমলের বিভাজনমূলক সমাজব্যবস্থা ভেঙে সাম্য ও ইনসাফের যে সমাজ সুলতানরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারই রেশ ধরে আজকের আধুনিক বাঙলাদেশ। ইতিহাসবিদদের মতে, সুলতানি আমল না থাকলে বাঙলা ভাষা হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেত।

Monday, March 2, 2026

যে ছবি চেতনার, প্রেরণার ও সাহসের...


যে ছবি চেতনার, প্রেরণার ও সাহসের...

দিনটি ছিল ০৯ নভেম্বর ২০২১। তখন আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সোনাগাজী সাথীশাখা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।


সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ খবর পেলাম- মহিলা জামায়াতের একটি প্রোগ্রামে পুলিশ ঘিরে রেখেছে। জানতে পারলাম, জেলা এবং উপজেলা মহিলা জামায়াতের নেতৃবৃন্দের সাথে আম্মুও সেই প্রোগ্রামে উপস্থিত আছেন।

পুলিশের বহু নাটকীয়তার পর উনাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো সোনাগাজী মডেল থানায়। সাজানো হলো নাটকের প্লট, গ্রেফতার দেখানো হলো 'বিশেষ ক্ষমতা আইনে'।

সেদিন সারারাত সবাই হাজতে নির্ঘুম বসে ছিলেন। আবদুল মোমেন সাহেদ ভাই সহ আমরা থানার ভিতরে যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস ও খাবার পৌঁছে দিই। বাইরে অপেক্ষা করছিলাম আর খোঁজ খবর রাখছিলাম কোনো কিছু প্রয়োজন হয় কিনা।

যদিও আমার থানার ভিতরে যাওয়া নিষেধ ছিলো, কিন্তু সেদিন মন মানেনি। ভিতরে গিয়ে আম্মুদের সাথে দেখা করে আসলাম। তারা একটুও বিচলিত ছিলেন না, তাদের মধ্যে কোনো ভয় দেখিনি সেদিন। বরং সেদিন শহীদ মোস্তাফিজের বোন(আম্মু) সহ আন্টিদের মাঝে ঈমানের এক অদ্ভুত দৃঢ়তা লক্ষ করেছিলাম।

পরদিন সকাল ১০টায় যথারীতি কোর্টে চালান করার জন্য যখন বের হচ্ছিলেন তখন এই ছবিটি তুলি। তারপর কোর্টে জামিন আবেদন করা হলে তা নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয় ক্যাঙ্গারু কোর্ট। অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ মহিলাদের কোনো কথাই শোনা হয়নি সেদিন। গ্রেফতারকৃত সকল মহিলাদের স্বামীদেরও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

ইঞ্জিনিয়ার ফখরুদ্দিন নানা সেদিন ফেইসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন-
"স্ত্রী কারাগারে, স্বামী পলাতক। এই হলো সংসার! ছেলেমেয়েরা কি করবে?"

নির্যাতনের মাত্রা শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, সেই সময়ে ফেনী জেলা কারাগারে সাক্ষাৎ বন্ধ ছিলো। স্বজনদের সাথে স্বাভাবিক সাক্ষাতের যে অধিকার তা থেকে বঞ্চিত করেছিলো হাসিনার ফ্যাসিস্ট প্রশাসন। পুরো দেড় মাসে মাত্র একদিন সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলাম কামাল ভাইয়ের সহযোগিতায়।

আম্মু সেদিন স্বাভাবিক ভাবেই সবার খোঁজখবর নিলেন। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকায় একটুও বিচলিত ছিলেন না। নিজের সাংগঠনিক কাজ, আব্বু ও ছোটভাই-বোনদের খেয়াল রাখার বিষয়ে বললেন। চিন্তা করতে নিষেধ করলেন।

দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশী সময় ধরে এই কনকনে শীতের মধ্যে অসুস্থ বয়োবৃদ্ধ মহিলাদের উপর অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন আল্লাহর আরশকে প্রকম্পিত করেছিলো। কারাগারে থেকে প্রায় সকলেই তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

আমাদের মায়েদের উপর চলা এই অবর্ণনীয় অত্যাচারের বদৌলতে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন তার দ্বীনকে এই জমীনে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ইনশাআল্লাহ।

- ইমাম হোসেন আরমান | ১০ নভেম্বর ২০২৫, ফেনী

Saturday, October 11, 2025

প্রচার বিমুখ এক বিরল ব্যক্তিত্ব || মরহুম অধ্যাপক এ.কে.এম. নাজির আহমদ



লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে ছাত্র, শিক্ষক তথা সর্বস্তরের মানুষের চিন্তার পরিশুদ্ধি ঘটানোই যার যাবতীয় কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য, দুনিয়ার লোভনীয় বৈষয়িক আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে যিনি সদা সচেষ্ট, কুরআন হাদীস তথা ইসলামী সাহিত্যে যার রয়েছে গভীর পান্ডিত্য, যিনি দুনিয়ার ঝামেলায় মোটেই নিজেকে জড়াতে চান না, প্রতিনিয়ত যিনি নিজেকে গর্হিত কাজ থেকে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করেন এবং আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, কথা ও কাজে মিল রেখে জীবনযাপন করছেন তিনি হলেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক নাজির আহমদ।

পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করে যারা নির্লোভ, নিরহংকার, গোপনে থেকে আল্লাহ প্রদত্ত মেধা, যোগ্যতা, সততা ও শ্রম দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের এই বাগানকে গড়ার কাজেই রত থাকেন। তেমনি একজন ক্ষণজন্মা ইসলামী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক একেএম নাজির আহমেদ।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েল ডিপার্টমেন্টের সেরা ছাত্র ছিলেন তিনি। ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক সম্ভাবনার হাত ছানিকে বাদ দিয়ে আমৃত্যু ইসলামী আন্দোলনের খেদমতে নিজের জীবনকে বিলীন করে দিয়েছেন এই মহান প্রাণপুরুষ। নিজের মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, লেখনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে এক ব্যতিক্রম অধ্যায় রচনা করেছিলেন তিনি। পরিচ্ছন্ন চিন্তা, রাসূল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ, শিরক এবং বিদআত মুক্ত জীবন-যাপনে তিনি ছিলেন অনড়।

তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রিয় সভাপতি ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি একাধারে একজন সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, লেখক বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি ও অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে নির্লোভ, পরোপোকারী, সদা হাস্যোজ্জল ইসলামী আন্দোলনের এক অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন।

ইসলামী আন্দোলনের এই প্রাণপ্রিয় আধ্যাত্মিক নেতা ২০১৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠার ২ জানুয়ারি ২০১৪ সালে তিনি দ্বিতীয় দফা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকেন। পরে ৭ জানুয়ারি ২০১৪ সালে তিনি রাত ১১ টা ১০ মিনিটে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি স্ত্রী, ৩ পুত্র, ২ কন্যা ও অসংখ্য আত্নীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে যান।

জন্ম ও শিক্ষাঃ অধ্যাপক একেএম নাজির আহমদ ১৯৩৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার বরুড়া থানার অন্তর্গত আড্ডা ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম- ওমর আলী ভূঁঞা এবং মাতার নাম- গোলাপ জাহান। তিনি নিজ গ্রামে পিতৃগৃহে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর স্থানীয় আড্ডা হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। বরাবরই তিনি ক্লাসে প্রথম হতেন। ১৯৫৭ সালে প্রথম বিভাগেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর ১৯৫৯ সাওে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমেডিয়েট পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ. অনার্স ও ৬৩ সালে কৃতিত্বের সাথে এম.এ. পাস করেন। তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল ল’ কলেজে আইন বিভাগে অধ্যয়ন করেন।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি একজন U.O.T.C ক্যাডেট ছিলেন। একবার পুরো ব্যাটেলিয়ান থেকে ৩৩ জন চৌকস ক্যাডেটকে বাছাই করা হয়। তিনি ছিলেন তাদের একজন।

ছাত্র ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন: সমাজের মাঝে ইসলামের সুমহান আদর্শ পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি অগ্রভাগে থেকে ভূমিকা পালন করেছেন। নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন ছাত্রনেতা তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রিয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি মুসলিম ছাত্র মজলিসের সভাপতি এ.কে.এম. হাবীবুর রহমান ও জেনারেল সেক্রেটারী শাহ আবদুল হান্নানের নিকট ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পান। অতঃপর অধ্যাপক সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী সাহেবের সংস্পর্শে আসেন। উল্লেখ্য সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী তদানিন্তন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। উল্লেখ্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তার জীবনে সাইয়্যেদ সাহেব এক বিরাট প্রভাব ফেলেন এবং চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। মূলত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী ছিলেন তার ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের শিক্ষাগুরু। প্রথমতঃ তিনি ১৯৬০ সালে মুসলিম ছাত্র মজলিসে যোগদান করেন, পরে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোদ দেন। ‘৬২ সালে ছাত্র সংঘের সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ছাত্র অঙ্গনে ইসলামী আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র হিসাবে আইন শাস্ত্র অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন। ১৯৬৫ সালের শেষ দিকে বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং’৬৬ সালেই সদস্য পদ লাভ করেন। অতপর ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর কুমিল্লা জিলার আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি শুধু মাত্র জামায়াতের রুকুনিয়াত রক্ষার জন্য কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের চাকুরী থেকে ইস্তফা দেন। পরে কুমিল্লা কলেজে অধ্যাপনা করেন।

কর্মজীবনঃ বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর তিনি নিজেকে আবার শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করেন এবং ’৭৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেন। কর্মজীবনে তিনি লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা কলেজ ও আবুজার গিফারী কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৯ সালের শেষভাগে ইসলামী গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন এবং ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে সুষ্ঠুভাবে উক্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

সাংগঠনিক জীবন: তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নায়েবে আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য। ১৯৬০ সালে ছাত্র জীবনেই ইসলামী আন্দোলনে জড়িত হন। তিনি ১৯৬৫ সাল থেকেই জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালে কুমিল্লা জেলা জামায়াতের আমীর নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সর্বশেষে ২০০৯ সাল থেকে নায়েবে আমীর হিসেবে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে বরুড়া থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রচার বিমুখ ব্যক্তি, বর্হিমুখী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজের চেয়ে আদর্শ মানুষ গড়ার কাজে স্বীয় চিন্তা ও যাবতীয় কর্মকান্ডে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন বেশী।

ইসলামী আন্দোলনের কঠিন সময়ে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আওয়ামী সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যখন কারাগারে বাকী নেতৃবৃন্দ যখন মামলা-হামলার কারণে প্রকাশ্য ময়দানে আসতে পারছে না তখন মাঠে থেকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সম্মানে ইফতার মাহফিল, কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার মাহফিল ও বিভিন্ন কর্মকান্ডে জামায়াতে ইসলামী মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বক্তব্যের ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত, প্রচন্ড শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত ও নেতা-কর্মীদের জন্য প্রেরণাদায়ক।

গ্রেফতারঃ ইসলামী আন্দোলনের অন্য শীর্ষ নেতাদের মতো তিনিও এ জালিম সরকারের গ্রেফতারের রোষানল থেকে রেহাই পাননি। গ্রেফতারের পর এই বয়ো:বৃদ্ধ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইসলামী ব্যক্তিত্বকেও পুলিশি রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সকল জুলুম-নির্যাতনের মোকাবেলায়ও তিনি ছিলেন অটল এবং অবিচল। তার গোটা জীবনে ছিলো সহজ-সরল, সাদামাটা তিনি ছিলেন সত্যিই একজন সফল নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি।

মূলত: তাঁর প্রিয়ভাজন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদাতের ঘটনা তাঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ সৃষ্টি হয়।

সাহিত্য কর্মঃ মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তন করে আদর্শ ও চরিত্রবান মানুষ গড়ার লক্ষ্যে তিনি অনকগুলো বই লিখেছেন। অধ্যাপক একেএম নাজির আহমদ ইসলামী সাহিত্যের অনবদ্য ভান্ডার গড়ে তুলেছেন। বড় বড় ইতিহাস ও জ্ঞানগর্ভ বিষয়সমূহ তিনি অতি সংক্ষেপে লিখেছেন। এটা তার বিরাট কৃতিত্ব যে, তিনি অতি বড় জিনিসও সংক্ষেপে পেশ করতে ও লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন। তাঁর লিখিত বইগুলো পড়লেই তা সহজে বুঝা যায়। বইগুলো হৃদয়গ্রাহী এবং চিন্তার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক ও উপযোগী। তাঁর ছোট ছোট বিষয় ভিত্তিক বইগুলো পাঠকদের কাছে শিক্ষকের মত ভূমিকা রাখে। ছোট-বড় মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তাঁর লিখিত বই সংখ্যা ৩৬টি। তাঁর লিখিত বই সারা বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের পাঠকদের কাছে সমাদৃত। পাশাপাশি তিনি হাদীসগ্রন্থ, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, আবু দাউদ শরিফ, নাসাঈ শরীফ ও রিয়াদুস সালেহীন সহ বিভিন্ন উৎস গ্রন্থ বিশুদ্ধ বাংলায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর অনুবাদ ইসলামী সাহিত্যাঙ্গনকে করেছে সমৃদ্ধ। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বই হলো- আল্লাহর দিকে আহবান, ইসলামী সংগঠন, আদর্শ মানব মুহাম্মদ (সা.), মহানবীর মহান আন্দোলন, যুগে যুগে ইসলামী জাগরণ, ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃত, বাংলাদেশের ইসলামের আগমন, আল্লাহর পরিচয়, দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, দ্বীন প্রতিষ্ঠার সঠিক পদ্ধতি, ইসলামের সোনালী যুগ, উসমানী খিলাফতের ইতিহাস ও সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী। এছাড়া তিনি বেশ কিছু বই অনুবাদ করেছেন।- কালজয়ী আদর্শ ইসলাম (সাইয়েদ কুতুব), অনাগত মানব সভ্যতা ও ইসলাম (সাইয়েদ কুতুব), পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎস (আবদুল হামীদ সিদ্দিকী), ইসলামী শিক্ষার মূলনীতি (অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ) ইত্যাদি। এদিকে তিনি ইসলামিক সেন্টারের গবেষণা সেলের মাধ্যমে সমসাময়িক বিষয়ের উপর দেশে খ্যাতনাম লেখক ও বুদ্ধিজীবিদের সমন্বয়ে অসংখ্য গবেষণা পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। দেশে-বিদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে পুরাতন ও ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণা পত্রিকা ‘মাসিক পৃথিবী’ সর্বাধিক প্রচারিত ও সমাদৃত। ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘কলম’ তাঁর অবদানের সাক্ষর হয়ে আছে। শিশু সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সব মিলিয়ে তাঁর লিখিত মৌলিক গ্রন্থ-পুস্তিকা প্রায় শতাধিক।


অধ্যাপক এ.কে.এম. নাজির আহমদ রচিত গ্রন্থাবলী

১. আল্লাহর দিকে আহবান

২. মহানবীর (সা) মহান আন্দোলন

৩. ইসলামের সোনালী যুগ

৪. ইসলামী সংগঠন

৫. সৃষ্টি ও দৃষ্টিকোণ

৬. পুরুষ ও মহিলাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্র

৭. আদর্শ শিক্ষক

৮. বাংলাদেশে ইসলামের আগমন

৯. ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নতি

১০. বর্তমান সভ্যতার সংকট

১১. আল্লাহর পরিচয়

১২. আল্লাহর পরিচয় ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস

১৩. ইসলামী বিপ্লবের স্বাভাবিক পদ্ধতি

১৪. যুগে যুগে ইসলামী জাগরণ

১৫. বসনিয়া হারজেগোভিনার ইতিকথা

১৬. ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি

১৭. সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী

১৮. উসমানী খিলাফতের ইতিকথা

১৯. ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃত

২০. আদর্শ মানব মুহাম্মদ (সা)

২১. ইসলামের দৃষ্টিতে ভাল ব্যবহার

২২. সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী

২৩. সূরাহ আল বাকারা (আয়াত ও অনুবাদ) -প্রকাশিতব্য


অনুবাদ গ্রন্থ

১. কালজয়ী আদর্শ ইসলাম

২. পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎস

৩. আগামী দিনের জীবন বিধান

৪. ইসলামী শিক্ষার মূলনীতি


পাঠ্য পুস্তক

১. বাংলা পড়া-১

২. বাংলা পড়া-২

৩. A Childs English

৪. English Lessons Book-1

৫. English Lessons Book-2

৬. বাংলা ব্যাকরণ ও প্রবন্ধ রচনা-১ম খ-

৭. বাংলা ব্যাকরণ ও প্রবন্ধ রচনা-২য় খ-।


ইসলামী আন্দোলনের এই মহান দিকপাল তাঁর রচিত সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের মাঝে জাগরুক থাকবেন শতাব্দী থেকে শতাব্দীকাল। মুসলিম উম্মাহর জন্য তিনি হয়ে থাকবেন প্রেরণার বাতিঘর।

আল্লাহভীরু নেতা জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য আঞ্জাম দিয়েছিলেন অক্ষরে-অক্ষরে। তাঁর দারসুল কুরআন এবং আসহাবে রাসূলের জীবনের উপরে আলোচনা সত্যিই ছিল ব্যতিক্রম। জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ অনেকেই ছিলেন তাঁরই হাতে গড়া মানুষ। আনুগত্যের পরম পরাকাষ্ঠা হয়ে তিনি জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ভূমিকা পালন করে গেছেন অনেকটাই নিরবে নিভৃতে।

সমাজ সেবাঃ তিনি ঢাকাস্থ ইসলামিক এডুকেশন সোসাইট ও বরুড়া আলফালাহ সোসাইটির চেয়ারম্যান এবং কুমিল্লা ইবনে তাইমিয়া ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

দেশ ভ্রমণঃ এ পর্যন্ত তিনি ১৪টি দেশ সফর করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে যোগদান করে বক্তব্য প্রদান করেছেন। বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও প-িত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মতবিনিময় করেছেন। তিনি ১৯৯৫ সালে হজ্বব্রত পালন করেন। উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালী, পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব-আমীরাত, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ সফর করেন।

বৈবাহিক জীবনঃ ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর বরুড়া থানার অর্জুনতলার মিঞা বাড়ীতে তিনি বিবাহ করেন। তার স্ত্রীর নাম মনোয়ারা বেগম। তাদের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে।

Tuesday, September 23, 2025

খেলাফত প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ : শরীয়াহ ও আধুনিক ইসলামী রাজনীতি বিশ্লেষণ || মাওলানা ইমাম হোসাইন


আধুনিক ইসলামী রাজনীতির তত্ত্বকে বাতিল বলে যারা খেলাফতের স্লোগান তুলছে—কথিত হারুন ইজহার, ত্বহা কিংবা আসিফ আদনান—বাস্তবে এরা একধরনের বর্ণচোরা ছাড়া কিছু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি এরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার কোনো কার্যক্রম জাতির সামনে উপস্থাপন করছে, নাকি কেবল একটি স্লোগান তুলে আধুনিক ইসলামী রাজনীতিকে বাতিল ঘোষণা করে জাতিকে ধোঁকা দিচ্ছে?

মূলত, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমত সমস্ত আলেমদের ঐকমত্যে একটি শূরা গঠন করা প্রয়োজন। সেই শূরার অধীনে একজন খলিফা বা আমীর নির্বাচিত হবেন। এরপর তিনি শূরার পরামর্শে মুসলিম জাতির কাছে তার পক্ষ থেকে বাইয়াত (আনুগত্য) গ্রহণের আহ্বান জানাবেন। যখন রাষ্ট্রের সকল স্তরে মুসলিমরা তার আনুগত্য স্বীকার করবে, তখন তিনি সেই রাষ্ট্রের খলিফা হবেন।

এই প্রক্রিয়ায় খেলাফতের আমীর বাইয়াতের আহ্বান জানানোর সাথে সাথেই বিদ্যমান অন্য সকল সরকার ও শাসনব্যবস্থা বাতিল বলে গণ্য হবে। আর তার বিরোধিতা করা মানে হবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা বৈধ। তবে শরীয়াহর মাসআলা অনুযায়ী, যদি কারো যুদ্ধ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত শক্তি না থাকে, তবে প্রতিষ্ঠিত সরকার জালিম হলেও তার আনুগত্য করতে হবে। (এটাই শরীয়াহর পদ্ধতি)।

আধুনিক রাজনীতিতে ইসলাম বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার নিয়মও প্রায় একই রকম। রাষ্ট্রের অধীনে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে। সেই দল জনগণের কাছে ইসলামী শরীয়াহ ও মূল্যবোধের পক্ষে জনমত তৈরি করবে। রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণ যখন ইসলামী দলকে সমর্থন দেবে, তখন তারা জনগণের পরোক্ষ সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার গঠন করবে। আর সেই সরকারের প্রধান, আইনসভার সদস্যদের পরামর্শে, রাষ্ট্রের মৌলনীতি ইসলামী মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠা করবে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

শরীয়াহর মাসআলায় যেমন বলা হয়েছে—শক্তি না থাকলে জালিম সরকার হলেও আনুগত্য করতে হবে—তার আধুনিক রূপই হলো গণতন্ত্র। এখন এই গণতন্ত্রকে এক কথায় পরিবর্তন করতে চাইলে যুদ্ধ করতে হবে। আর যদি যুদ্ধ করার শক্তি না থাকে, তবে গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। ইসলামী দলগুলো এ নীতির আলোকে গণতন্ত্রের কাঠামো ব্যবহার করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে।

উপরোক্ত দুটি পদ্ধতির মধ্যে প্রায় ৯০% মিল রয়েছে। সামগ্রিকভাবে খুব বেশি পার্থক্য নেই। বরং প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টি বর্তমান বিশ্বে অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু আমাদের দেশের তথাকথিত "খেলাফত স্লোগানদাতা"রা না প্রথম পদ্ধতিতে কোনো কাজ করছে, না দ্বিতীয় পদ্ধতিতে। বরং যেসব ইসলামী দল দাওয়াহ ও কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজ করছে এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করছে, তাদের কোনো রোডম্যাপ না দিয়েই এরা ইসলামী রাজনীতিকে হারাম ঘোষণা করছে। এটি নিঃসন্দেহে একধরনের বর্ণচোরা আচরণ।

তাদের নেই খেলাফত প্রতিষ্ঠার কোনো কর্মসূচি, নেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো রূপরেখা। বরং তারা এক একজন পশ্চিমা এজেন্ডার বাহক ছাড়া কিছুই নয়।

ভোট না দেওয়ার যে যুক্তি এরা সামনে আনে, সেটিই আগামীকাল আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য বড় দায় হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, তাদের এ যুক্তিতে উৎসাহিত হয়ে মুসলিমরা যদি ভোট না দেয়, আর সেই কারণে কোনো জালিম শাসক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার এদের ওপরই বর্তাবে।

লেখক:
মাওলানা ইমাম হোসাইন 
শিক্ষক | লেখক | গবেষক 

Friday, August 22, 2025

বইনোট : শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামী রূপরেখা | অধ্যাপক গোলাম আযম (রাহি.)

বইনোট : শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামী রূপরেখা | অধ্যাপক গোলাম আযম (রাহি.)

১) ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট

১৯৫৬–৬১ সালে পাকিস্তানের শিক্ষা কমিশনকে ঘিরে লেখকের গবেষণা ও প্রবন্ধ থেকে বইটির সূত্রপাত। বারবার আলোচনা ও পরিমার্জনের পর এটি ২০০৪ সালে প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়। লেখকের অভিযোগ, নীতিমালায় নৈতিকতা ও ইসলামী চেতনা অনুপস্থিত।

সারাংশ: বইটি দীর্ঘ আলোচনার ফসল; মূল সমস্যা—ইসলামী ভিত্তির অভাব।


২) বইয়ের উদ্দেশ্য

বাংলাদেশে শিক্ষা দুই মেরুতে—মাদ্রাসা বনাম আধুনিক শিক্ষা। কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়। বইটির উদ্দেশ্য: ইসলামী আদর্শে ভিত্তিকৃত সমন্বিত শিক্ষার রূপরেখা দেওয়া।

সারাংশ: সমন্বিত ইসলামী-আধুনিক শিক্ষা দরকার।


৩) চারটি মৌলিক প্রশ্ন

শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে আগে নির্ধারণ করতে হবে:

১) শিক্ষা কী?

২) মানুষ কে?

৩) জাতীয় আদর্শ কী?

৪) বিদ্যমান শিক্ষার সমস্যা কোথায়?

সারাংশ: কাঠামোর আগে দর্শন জরুরী


৪) শিক্ষা কী

শিক্ষা হলো—“পরিকল্পিত ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে গুণাবলি ও জ্ঞান বিকাশ।” অন্য প্রাণীরা স্বভাবত শিখে, কিন্তু মানুষের জন্য কৃত্রিম/সচেতন আয়োজন দরকার।

সারাংশ: শিক্ষা = পরিকল্পিত মানবিক বিকাশ।


৫) মানুষ কে?

মানুষ দেহ–আত্মার সমন্বয়ে গঠিত নৈতিক জীব। শুধু জ্ঞান বা প্রযুক্তি নয়, নৈতিকতা ছাড়া শিক্ষা ব্যর্থ। দেহ বাহন, আত্মা পরিচালক।

সারাংশ: মানুষ নৈতিক-সত্তা, দেহ–আত্মা ভারসাম্য জরুরি।


৬) দেহ–আত্মার দ্বন্দ্ব

শুধু ভোগবাদ (দেহ) বা শুধু বৈরাগ্য (আত্মা) অমানবিক। ইসলাম মধ্যপথ নির্দেশ করে—প্রবৃত্তি ও বিবেকের সমন্বয়।

সারাংশ: শিক্ষা হবে প্রবৃত্তি–বিবেকের ভারসাম্যপূর্ণ।


৭) মানুষের উপযোগী শিক্ষা

কেবল ভৌত বা কেবল আধ্যাত্মিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। নৈতিক সীমার ভেতরে আধুনিক জ্ঞান প্রয়োগ করতে শেখায় এমন শিক্ষাই সঠিক।

সারাংশ: উপযোগী শিক্ষা = নৈতিকতা + জ্ঞান।


৮) জাতীয় আদর্শ ও শিক্ষা

প্রতিটি রাষ্ট্র শিক্ষায় নিজস্ব আদর্শ প্রতিফলিত করে। আদর্শ ছাড়া শিক্ষা অর্থহীন।

সারাংশ: শিক্ষা গড়ে আদর্শের মানুষ।


৯) বাংলাদেশের জাতীয় আদর্শ—ইসলাম

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাস, সংবিধান ও জনমত অনুযায়ী জাতীয় আদর্শ ইসলাম। সেক্যুলার ধারাকে জনগণ ও আইন প্রত্যাখ্যান করেছে।

সারাংশ: জাতীয় আদর্শ ইসলাম।


১০) শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য

ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তোলা নাগরিক, যারা আধুনিক জ্ঞানে দক্ষ হবে।

সারাংশ: আধুনিক দক্ষতা + ইসলামী নৈতিকতা।


১১) প্রধান অন্তরায়: দ্বিমুখী শিক্ষা

মাদ্রাসায় আধুনিক জ্ঞানের ঘাটতি, আধুনিক ধারায় ইসলামী চেতনার ঘাটতি। সমাধান: মেলবন্ধন।

সারাংশ: বিভক্ত শিক্ষা একতা ভাঙে।


১২) সংস্কারচেষ্টার সীমাবদ্ধতা

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—বিভিন্ন কমিশন ধর্মকে কেবল “বিষয়” বানিয়েছে, পূর্ণ দর্শন নয়। ফলে বাস্তবায়ন হয়নি।

সারাংশ: কমিশন রিপোর্ট আছে, পরিবর্তন হয়নি।


১৩) আধুনিক শিক্ষার গলদ

পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জ্ঞান শেখানো হয়, পরে দীনিয়াত যোগ করলে তা বেমানান লাগে।

সারাংশ: সেক্যুলার কোর + ধর্মীয় অ্যাড-অন = দ্বিধা।


১৪) ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কী চায়?

শুধু নামাজ–রোজা নয়; অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান—সবকিছুতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত শিক্ষা।

সারাংশ: ইসলাম = পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা


১৫) ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

১) দীন–দুনিয়া মিলিত।

২) সব জ্ঞান ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে।

৩) ইসলামী পরিবেশ।

৪) উচ্চশিক্ষায় তুলনামূলক শ্রেষ্ঠতা।

৫) কুরআন–হাদিস–ফিকহে দক্ষতা।

সারাংশ: বিষয়বস্তু + পরিবেশ + উৎসে দক্ষতা।


১৬) বাস্তব রূপ (ক) দীন–দুনিয়া একীভূত

ধর্মীয়–পার্থিব আলাদা নয়। সব কাজ ইসলামী সীমায় হলে ইবাদত।

সারাংশ: শিক্ষা-জীবন একক ব্যবস্থা।


১৭) বাস্তব রূপ (খ) পরোক্ষ পদ্ধতি

শিক্ষায় সরাসরি নীতিশিক্ষা নয়; বিষয়ভিত্তিক উদাহরণে ইসলামী নীতি শেখানো। যেমন: সুদের অঙ্ককে যুলুম হিসেবে উপস্থাপন।

সারাংশ: বিষয়ভিত্তিক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি।


১৮) বাস্তব রূপ (গ) পরিবেশ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামাজ, পর্দা, নৈতিকতা—এসব অনুশীলন থাকতে হবে।

সারাংশ: পরিবেশ গড়ে চরিত্র।


১৯) বাস্তব রূপ (ঘ) উচ্চশিক্ষা

উচ্চশিক্ষায় ইসলামী বনাম পাশ্চাত্য দর্শনের তুলনা—ইসলামের যুক্তিগত শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করা।

সারাংশ: উচ্চশিক্ষায় ইসলামী কোর অপরিহার্য।


২০) উৎসে দক্ষতা

কুরআন–হাদিস–ফিকহে গভীর জ্ঞান থাকা জরুরি।

সারাংশ: উৎসে দক্ষতা ছাড়া শিক্ষার গভীরতা আসে না।


২১) শিক্ষকের ভূমিকা

শিক্ষকই আদর্শ। বইয়ের চেয়ে শিক্ষকের চরিত্র বড়।

সারাংশ: শিক্ষকই আসল কারিকুলাম।


২২) আধুনিক শিক্ষা-বিজ্ঞান ব্যবহার

আধুনিক টুলস (টেকনোলজি, গবেষণা) ইসলামী শিক্ষায় কাজে লাগাতে হবে।

সারাংশ: আধুনিক টুলস ইসলামী নীতিতে কাজে লাগান।


২৩) উপসংহার

পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সম্ভব, তবে ছোট ছোট মডেল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। “ইসলামই বাঁচিয়েছে, ইসলামই বাঁচাবে”—এই আশাবাদে সমাপ্তি।

সারাংশ: ছোট মডেল থেকে জাতীয় রূপায়ণ।


পুরো বইয়ের সামারি:

সমস্যা: দ্বিমুখী শিক্ষা ও আদর্শশূন্য দৃষ্টি।

সমাধান: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে দীন–দুনিয়া একীভূত শিক্ষা, পরিবেশ-নির্ভর চরিত্রগঠন, উৎসে দক্ষতা ও আধুনিক টুলসের সৃজনশীল ব্যবহার।


সংকলনে: আরমানের খেরোখাতা

Saturday, August 2, 2025

২০২৫ সালের সেরা AI টুলস | যেগুলো আপনার কাজকে ১০ গুণ দ্রুত করবে

২০২৫ সালের সেরা AI টুলস | যেগুলো আপনার কাজকে ১০ গুণ দ্রুত করবে

বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, বরং এখনকার কাজকর্মের অতি প্রয়োজনীয় একটি অংশ হয়ে উঠেছে। অফিসিয়াল কাজ, পড়াশোনা, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ভাষান্তর কিংবা ভিডিও সম্পাদনা—সবকিছুতেই AI টুলস গুলো আমাদের সময় ও শ্রম অনেকটা বাঁচাচ্ছে।


AI টুল ব্যবহারের সুবিধা:

•সময় সাশ্রয়

•কম ভুল

•কম দক্ষতায়ও পেশাদার মানের আউটপুট

•ছাত্র, শিক্ষক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও চাকরি প্রার্থী—সবার জন্য উপযোগী


২০২৫ সালে যেসব AI টুলস সবার চেয়ে বেশি কার্যকর ও জনপ্রিয়, সেগুলোর একটি তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো। এগুলো আপনার কাজের গতি ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।


১. ChatGPT-4o (OpenAI)

•লেখালেখি, ব্লগ, কোডিং, ইমেইল লেখা, প্রশ্নের উত্তর, কনটেন্ট আইডিয়া তৈরিতে অসাধারণ।

•কাস্টম GPT এবং নানা থার্ড পার্টি টুলস একসাথে ব্যবহার করা যায়।

•বাংলাতেও কার্যকরভাবে কাজ করে

লিংক: https://chat.openai.com


২. Claude 3 (Anthropic)

•দীর্ঘ ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ, প্রোডাক্টিভিটি টুল এবং নিরাপদ AI চ্যাট সহকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

•ব্যবহার সহজ এবং প্রম্পট রেসপন্সে স্মার্ট।

•লম্বা ডকুমেন্ট বা PDF আপলোড করে সারমর্ম পাওয়ার জন্য

•একাডেমিক ও গবেষণাধর্মী কাজে বেশ কার্যকর

•বড় লেখাকে সহজ ভাষায় সংক্ষেপ করতে সক্ষম

লিংক: https://claude.ai



৩. Google Gemini

•গুগলের নিজস্ব অ্যাসিস্ট্যান্ট-নির্ভর AI টুল।

•Google Docs, Gmail, ও Google Meet-এর সাথে সংযুক্ত হয়ে কাজ সহজ করে তোলে।

•সহজে প্রেজেন্টেশন তৈরি করার AI টুল

•PowerPoint না জানলেও ব্যবহার করা যায়

•শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস প্রেজেন্টেশনে কার্যকর

লিংক: https://gamma.app


৪. Microsoft Copilot

•Word, Excel, PowerPoint-এর মধ্যেই AI যুক্ত হয়েছে Copilot-এর মাধ্যমে।

এক ক্লিকে রিপোর্ট, ডাটা বিশ্লেষণ, চার্ট, প্রেজেন্টেশন তৈরি করা যায়।

•Microsoft Teams ও Outlook-এও ব্যবহারযোগ্য।

🔗 https://copilot.microsoft.com


৫. Perplexity AI

•AI-বেইসড সার্চ ইঞ্জিন ও গবেষণার জন্য উপযুক্ত।

•ফ্যাক্টসহ উত্তর এবং সোর্স সহ বিশ্লেষণ দেয়।

গবেষণা বা লেখার সময় তথ্য যাচাই করতে উপযুক্ত।

🔗 https://www.perplexity.ai


৬. Notion AI

•নোট নেওয়া, কনটেন্ট লেখা, ডকুমেন্ট সাজানো—সবকিছুতে সহায়ক।

•ছাত্রছাত্রী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আদর্শ।

AI দিয়ে লেখা সাজানো, সারাংশ করা, রিমাইন্ডার তৈরির সুবিধা।

🔗 https://www.notion.so/product/ai


৭. Grammarly GO

•ইংরেজি লেখার সময় ভুল ধরার পাশাপাশি এখন নিজে নিজে কনটেন্ট সাজিয়ে দিতে পারে।

প্রফেশনাল ইমেইল, ব্লগ ও রিসার্চ রাইটিংয়ে কার্যকর।

🔗 https://www.grammarly.com/go


৮. Canva AI Tools (Magic Write, Magic Edit)

•ডিজাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট তৈরির জন্য অসাধারণ টুলস।

•অটো ডিজাইন সাজানো, লেখা তৈরি, ছবি এডিট করার সুবিধা রয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট, প্রেজেন্টেশন, পোস্টার তৈরিতে দারুণ।

🔗 https://www.canva.com/ai/


৯. QuillBot & Wordtune

•প্যারা রিফ্রেজ, সারাংশ তৈরি, প্রফেশনাল লেখালেখির জন্য কার্যকরী।

•ছাত্রছাত্রীদের জন্য খুবই উপযোগী।

🔗 https://quillbot.com


Wordtune:

•লেখা আরও প্রফেশনাল বা সহজভাবে প্রকাশ করতে সহায়তা করে।

 🔗 https://www.wordtune.com


১০. Pika Labs & Sora (Text-to-Video)

•কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ভবিষ্যৎ টুলস।

•AI দিয়ে লিখা থেকে ছোট ভিডিও বানানো যায়। 

🔗 https://www.pika.art


Sora (by OpenAI):

•এখনো পাবলিকলি পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়, তবে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে।

•নিখুঁত সিনেমাটিক ভিডিও জেনারেট করতে পারে।

🔗 https://openai.com/sora


উপসংহার:

২০২৫ সালে এই AI টুলসগুলো কেবল প্রযুক্তির চমক নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। যেকোনো কাজকে সহজ, দ্রুত এবং মানসম্পন্ন করতে এই টুলগুলো ব্যবহার করে আপনি এগিয়ে থাকতে পারেন অন্যদের চেয়ে অনেকটাই।

আজই ব্যবহার শুরু করুন আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সেরা AI টুলটি!

Saturday, June 14, 2025

শিবির সংগীত | পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে আমরা শিবির গড়েছি

শিবির সংগীত গীতিকার : ডা. মোর্শেদ আলী  পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে আমরা শিবির গড়েছি শপথের সঙ্গিন হাতে নিয়ে সকলে নবীজির রাস্তা ধরেছি আমরা শিবির গড়েছি।  এই শিবিরের শান্তিছায়ায় মজলুম মানবতা নেবে যে গো ঠাঁই মানুষ গড়ার এই আঙ্গিনায় আল কোরানের বাণী পড়েছি আমরা শিবির গড়েছি।২  আমাদের কেহ তিতুমীর হয়ে জালিমের কন্ঠ রুখবে শরীয়তুল্লাহর ইসলামী বিপ্লব ছাত্র জনতা গড়বে।  এই জিহাদের দীপ্ত শপথে পথচলা শুরু হোক তবে আজি হতে শান্তি আনবো বিশ্ব জগতে সত্য শপথ করেছি আমরা শিবির গড়েছি।  শাহজালালের পুণ্য জিহাদে একদিন জনগণ জাগবে শাহ মাখদুমের সংগ্রামী ছোঁয়া প্রানে প্রানে সকলের লাগবে।  হে মহাদিশারী আলোর কাফেলা জেগে ওঠো জেগে ওঠো তবে এই বেলা মুক্তির সূর্য উদয়ের লগ্নে তারি আয়োজন আজ করেছি। আমরা শিবির গড়েছি।

শিবির সংগীত
গীতিকার : ডা. মোর্শেদ আলী

পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে
আমরা শিবির গড়েছি
শপথের সঙ্গিন হাতে নিয়ে সকলে
নবীজির রাস্তা ধরেছি
আমরা শিবির গড়েছি।।

এই শিবিরের শান্তিছায়ায়
মজলুম মানবতা নেবে যে গো ঠাঁই
মানুষ গড়ার এই আঙ্গিনায়
আল কোরানের বাণী পড়েছি
আমরা শিবির গড়েছি।২

আমাদের কেহ তিতুমীর হয়ে
জালিমের কন্ঠ রুখবে
শরীয়তুল্লাহর ইসলামী বিপ্লব
ছাত্র জনতা গড়বে।

এই জিহাদের দীপ্ত শপথে
পথচলা শুরু হোক তবে আজি হতে
শান্তি আনবো বিশ্ব জগতে
সত্য শপথ করেছি
আমরা শিবির গড়েছি।২

শাহজালালের পুণ্য জিহাদে
একদিন জনগণ জাগবে
শাহ মাখদুমের সংগ্রামী ছোঁয়া
প্রানে প্রানে সকলের লাগবে।

হে মহাদিশারী আলোর কাফেলা
জেগে ওঠো জেগে ওঠো তবে এই বেলা
মুক্তির সূর্য উদয়ের লগ্নে
তারই আয়োজন আজ করেছি।
আমরা শিবির গড়েছি।২

Thursday, May 22, 2025

দারসুল কুরআন || সুরা আন নাবা (৩৮-৪০নং আয়াত) || শেষ বিচার দিবসের ভয়াবহ চিত্র

দারসুল কুরআন || সুরা আন নাবা (৩৮-৪০নং আয়াত) || শেষ বিচার দিবসের ভয়াবহ চিত্র
আরবী ইবারত:

يَوۡمَ يَقُومُ ٱلرُّوحُ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ صَفࣰّاۖ لَّا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنۡ أَذِنَ لَهُ  ٱلرَّحۡمَٰنُ وَقَالَ صَوَابࣰا 

ذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمُ ٱلۡحَقُّۖ فَمَن شَآءَ ٱتَّخَذَ إِلَىٰ رَبِّهِۦ مَآبًا 

إِنَّآ أَنذَرۡنَٰكُمۡ عَذَابࣰا قَرِيبࣰا يَوۡمَ يَنظُرُ ٱلۡمَرۡءُ مَا قَدَّمَتۡ يَدَاهُ وَيَقُولُ   ٱلۡكَافِرُ يَٰلَيۡتَنِي كُنتُ تُرَٰبَۢا

সরল অনুবাদ:

(৩৮) সেদিন রূহ (জিবরাঈল) আর ফেরেশতারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে, কেউ কোন কথা বলতে পারবে না, সে ব্যতীত যাকে পরম করুণাময় অনুমতি দিবেন, আর সে যথার্থ কথাই বলবে।

(৩৯) এ দিনটি সত্য, সুনিশ্চিত, অতএব যার ইচ্ছে সে তার প্রতিপালকের দিকে আশ্রয় গ্রহণ করুক।

(৪০) আমি তোমাদেরকে নিকটবর্তী শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি, যেদিন মানুষ দেখতে পাবে তার হাতগুলো আগেই কী (‘আমাল) পাঠিয়েছে আর কাফির বলবে- ‘হায়! আমি যদি মাটি হতাম (তাহলে আমাকে আজকের এ ‘আযাবের সম্মুখীন হতে হত না)।

•সূরাটির নামকরণ: অত্র সূরার ২য় আয়াত عَنِ النَّبَلِ الْعَظِيمِ থেকে (النَّبَأ) শব্দটিকে এই সূরার নাম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। النَّبَأ শব্দের অর্থ সংবাদ বা খবর। অর্থাৎ কেয়ামত ও পরকালের মহা খবরকে বোঝানো হয়েছে। অন্যান্য সূরার মতো এই সূরার নামকরণ কেবলমাত্র পরিচিতি বা চেনার জন্যই নয় বরং এই সূরার আলোচ্য বিষয়ের শিরোনামও বটে। কেননা এই সূরার সমস্ত আলোচনাই কেয়ামত ও পরকাল সম্পর্কিত।

•সূরাটি নাযিল হবার সময়কালঃ সূরা কেয়ামাহ্ থেকে সূরা নাযিয়াত পর্যন্ত সব কয়টি সূরার বিষয়বস্তু প্রায় একই রকমের। আর এই সব কয়টি সূরা-ই রাসূলে করীম (সাঃ) এর মক্কী জীবনের প্রথম দিকে নাযিল হয়েছে বলে মনে হয়। সুতরাং এই সূরাটিও নবুয়াত লাভের প্রথম দিকের 'মাক্কী সূরা'।

•সূরাটির মূল বিষয়বস্তুঃ আলোচ্য সূরাটির মূল বিষয়বস্তু হলো কেয়ামত ও পরকালের প্রমাণ এবং তা মানা না মানার পরিণতি সম্পর্কে লোকদেরকে অবহিত করা।

শানে নূযুলঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, আল-কুরআন নাযিল শুরু হলে মক্কার কাফেরেরা তাদের বৈঠকে বসে এ বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করতো যে, কুরআনে কেয়ামত অর্থাৎ আখেরাতের আলোচনাকে খুব বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ এটা তাদের মতে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। তাই এ সম্পর্কে খুব বেশী বেশী আলোচনা-পর্যালোচনা চলতো। কেউ কেউ একে সত্য মনে করতো, আর কেউ একে অস্বীকার করতো। তাই আল্লাহ্ পাক হাশরের দিবস ও ভয়াবহ শাস্তি সম্পর্কে আলোচ্য আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। 


আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যা:

আয়াত : ৩৮

يَوْمَ يَقُومُ ٱلرُّوحُ وَٱلْمَلَٰٓئِكَةُ صَفࣰّاۖ لَّا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنۡ أَذِنَ لَهُ ٱلرَّحْمَٰنُ وَقَالَ صَوَابًا

বাংলা অনুবাদ:

“সেদিন ‘রূহ’ (জিবরাঈল) ও ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। কেউ কথা বলতে পারবে না, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া, যাকে পরম করুণাময় অনুমতি দেবেন এবং সে সঠিক কথাই বলবে।”

ব্যাখ্যা:

1. ‘রূহ’ ও ‘মালায়েকাহ্‌ – এখানে “রূহ” বলতে অধিকাংশ মুফাসসির (যেমন, ইবন কাসীর, কুরতুবী) জিবরাঈল (আ.)-কে বুঝিয়েছেন। তার মর্যাদা ও গুরুত্বের কারণে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনে জিবরাঈলকে “روح الأمين” (বিশ্বস্ত রূহ) বলা হয়েছে (সূরা আশ-শু'আরা, ২৬:১৯৩)।

2. সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো – ফেরেশতারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে, যা তাঁর জাঁকজমক ও মহিমা প্রদর্শন করে (সূরা ফজর ৮৯:২২-২৩)।

3. কথা বলার অনুমতি – কিয়ামতের দিন কাউকে কথা বলার অনুমতি থাকবে না, একমাত্র আল্লাহ যাকে দিবেন।

যেমন বলা হয়েছে, "يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِّنَفْسٍ شَيْئًا" (সূরা ইনফিতার, ৮২:১৯)।

আর সে অনুমতি পাওয়া লোকটি সঠিক কথা বলবে – অর্থাৎ সাক্ষ্য দিবে ন্যায়ের পক্ষে, যেমন নবী, সিদ্দিক, শহীদ, বা নেক বান্দারা।

4. হাদীস রেফারেন্স:

হাদীসে এসেছে, কিয়ামতের দিন মানুষ বলবে: "نَفْسِي نَفْسِي" (আমার জান, আমার জান)। কেবল রাসূল (সা.) বলবেন: "أُمَّتِي أُمَّتِي" (আমার উম্মত, আমার উম্মত)। (সহীহ মুসলিম)


আয়াত : ৩৯

ذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمُ ٱلۡحَقُّۖ فَمَن شَآءَ ٱتَّخَذَ إِلَىٰ رَبِّهِۦ مَـَٔابًا

বাংলা অনুবাদ:

“এ দিনটি সত্য ও সুনিশ্চিত। অতএব, যার ইচ্ছে সে তার প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাওয়ার পথ অবলম্বন করুক।”

ব্যাখ্যা:

1. يَوْمُ الحَقّ – কিয়ামতের দিন কোনো কল্পনা বা অনুমান নয়, বরং একেবারে নিশ্চিত বাস্তবতা। কুরআনে একে "يَوْمُ الْوُعُودِ" (প্রতিশ্রুত দিবস) হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে (সূরা ক্বাফ, ৫০:২০)।

2. মা’আব গ্রহণ – “মা’আব” অর্থ: ফিরে যাওয়ার স্থান বা আশ্রয়। এখানে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন থেকে রক্ষা পেতে চাইলে এখনই আল্লাহর দিকে ফিরে যাও (তাওবা, ইবাদত, সৎকর্ম)।

3. হাদীস রেফারেন্স:

রাসূল (সা.) বলেন: “দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।” (শু‘আবুল ঈমান, বাইহাকি)

যার ইচ্ছা সে এখনই আমল করে জান্নাতের আশ্রয় লাভ করতে পারে।


আয়াত : ৪০

إِنَّآ أَنذَرۡنَٰكُمۡ عَذَابࣰا قَرِيبࣰا يَوۡمَ يَنظُرُ ٱلۡمَرۡءُ مَا قَدَّمَتۡ يَدَاهُ وَيَقُولُ ٱلۡكَافِرُ يَٰلَيۡتَنِي كُنتُ تُرَٰبَۢا

বাংলা অনুবাদ:

“আমি তোমাদেরকে এক নিকটবর্তী শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি। যেদিন মানুষ দেখতে পাবে তার হাত কী প্রেরণ করেছে, আর কাফির বলবে: হায়, আমি যদি মাটি হতাম!”

ব্যাখ্যা:

1. নিকটবর্তী শাস্তি – এটি দুনিয়ার শাস্তি, মৃত্যু, কবর অথবা কিয়ামতের সূচনা – সবই ঘনিয়ে আসছে।

কুরআনেও বলা হয়েছে: "اقتربت الساعة" – “সময় ঘনিয়ে এসেছে” (সূরা ক্বামার, ৫৪:১)।

2. নিজ আমল দেখবে – প্রত্যেক মানুষ তার নিজের হাত দ্বারা প্রেরিত (আমলনামা) দেখতে পাবে।

সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮ – “যে অণু পরিমাণ ভাল কাজ করেছে, তা সে দেখতে পাবে…”

3. কাফিরদের অনুশোচনা – তারা এত ভয়ানক শাস্তি দেখে বলবে: “হায়, আমি যদি শুধু মাটিই হতাম!”

ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, কাফির তখন পশুদের মতো নিস্তব্ধ অস্তিত্ব কামনা করবে, যারা হাশরে উঠলেও শাস্তি পাবে না।

4. হাদীস রেফারেন্স: হাদীসে আছে: কিয়ামতের দিন পশুরাও বিচার পাবে, তারপর মাটিতে পরিণত হবে। তখন কাফির বলবে: "হায়! আমি যদি পশু হতাম!" (মুসলিম: ৪/২১৯৭)


দারসের শিক্ষা:

1. কিয়ামতের দিন একটি সুনিশ্চিত বাস্তবতা – সেটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এটি আসবেই।
2. আল্লাহর সামনে জবাবদিহির দিন হবে খুবই ভয়াবহ – এমনকি ফেরেশতারাও বিনা অনুমতিতে কিছু বলবে না।
3. কেয়ামতের দিনে কেবল আল্লাহর অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই কথা বলবে – এবং তারা কেবল ন্যায়ের কথা বলবে।
4. জবাবদিহির জন্য প্রতিটি আমল সংরক্ষিত হচ্ছে – মানুষ তার জীবনে যা করেছে, কিয়ামতের দিন তা তার সামনে পেশ করা হবে।
5. আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এখনই সময় – কিয়ামতের আগেই তাওবা, ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে "মা'আব" (আশ্রয়স্থল) গ্রহণ করতে হবে।
6. আফসোসে কোনো লাভ হবে না – কাফিররা কিয়ামতের দিনে বলবে, “হায়, আমি যদি মাটি হতাম!” কিন্তু তখন তা কোনো কাজে আসবে না।
7. বিশ্বাস ও সৎকর্মই চূড়ান্ত পরিত্রাণের পথ – দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
8. আল্লাহর সতর্কবার্তা অবহেলা নয়, গ্রহণের যোগ্য – এই আয়াতগুলো আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আগাম সতর্কবার্তা।